‘পৃথিবীর নরক’ বন্দিশিবিরে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট
- আপডেট সময় : ০৩:২৬:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬
- / 92
যুক্তরাষ্ট্রের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের ভাষায় যে কারাগারকে ‘নরকের মতো’ বলা হয়, সেখানেই বর্তমানে বন্দি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। এমনকি কয়েকজন মার্কিন বিচারকও এই কারাগারে দণ্ডপ্রাপ্তদের পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
কারাগারটির নাম মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টার (এমডিসি)—অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ব্রুকলিনে।
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এক নজিরবিহীন অভিযানে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়। দক্ষিণ আমেরিকায় সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে এটি ছিল অন্যতম ব্যতিক্রমী সামরিক অভিযান।
আটক হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মাদুরোকে আকাশপথে প্রথমে ইউএসএস ইয়ু জিমা জাহাজে, পরে কিউবার গুয়ানতানামো নৌঘাঁটিতে, এবং সেখান থেকে আরেকটি বিমানে করে নিউইয়র্কে নেওয়া হয়।
নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর প্রকাশিত এক ভিডিওতে মাদুরোকে বলতে শোনা যায়,
“তোমরা তো শুভরাত্রীকে ‘বুয়েনাস নোচেস’ বলো, তাই না? গুড নাইট! হ্যাপি নিউ ইয়ার!”
ভিডিওতে তাকে হাতকড়া পরা অবস্থায় দুইজন মাদকবিরোধী এজেন্টের পাহারায় হাঁটতে দেখা যায়। তার পরনে ছিল স্পোর্টস জ্যাকেট, মাথায় কালো টুপি এবং পায়ে মোজা পরা স্যান্ডেল।
হুগো চ্যাভেজের উত্তরসূরি মাদুরোকে প্রথমে ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ)–এর সদরদপ্তরে নেওয়া হয়। এরপর তাকে ব্রুকলিনের এমডিসির একটি কক্ষে রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার আওতায় তার বিরুদ্ধে আনা মাদক পাচার ও নার্কো-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগের বিচার চলাকালীন সময়েও তাকে এখানেই রাখা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই কারাগারে বন্দি রয়েছেন তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও।
🏢 একটি উল্লম্ব কারাগার
মাদুরোকে যে মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছে, সেটি কংক্রিট ও স্টিলের তৈরি একটি বিশাল বহুতল ভবন। কারাগারটির অবস্থান ব্রুকলিনের সমুদ্রবন্দর এলাকা থেকে কয়েক মিটার দূরে এবং ফিফথ অ্যাভিনিউ ও সেন্ট্রাল পার্ক থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে।
নিউইয়র্ক শহরের দীর্ঘদিনের কারাগার সংকট ও অতিরিক্ত বন্দির চাপ সামাল দিতে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে এমডিসি চালু করা হয়। আগে যেখানে সমুদ্রবন্দরের পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের স্থাপনা ছিল, সেখানেই গড়ে ওঠে এই কারাগার।
ফেডারেল ব্যুরো অব প্রিজনস (বিওপি) জানায়, ম্যানহাটন ও ব্রুকলিনের আদালতে বিচারাধীন নারী ও পুরুষ আসামিদের রাখাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। বর্তমানে নিউইয়র্কে বিওপি পরিচালিত এটিই একমাত্র কারাগার। ২০২১ সালে ম্যানহাটনের অনুরূপ একটি কারাগার বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এর পেছনে বড় কারণ ছিল ২০১৯ সালে মার্কিন ব্যবসায়ী জেফ্রি এপস্টেইনের আত্মহত্যা। তার বিরুদ্ধে যৌনকর্মী পাচার ও পতিতাবৃত্তির অভিযোগ ছিল।
🔥 ‘নরকের মতো অবস্থা’
লাতিন আমেরিকার বহু কারাগারের মতোই এমডিসিতেও রয়েছে অতিরিক্ত বন্দি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সহিংসতার সমস্যা। এক হাজার বন্দির ধারণক্ষমতা থাকলেও ২০১৯ সালে এখানে প্রায় ১,৬০০ বন্দি রাখা হয়েছিল। বর্তমানে বন্দির সংখ্যা ১,৩৩৬ জন।
এছাড়া কারাগারটি দীর্ঘদিন ধরে মাত্র ৫৫ শতাংশ জনবল নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে—এ তথ্য ২০২৪ সালের নভেম্বরে আদালতের নথি উদ্ধৃত করে জানায় এপি নিউজ।
২০১৯ সালে এক বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে শীতের মাঝামাঝি সময়ে কয়েক দিন বন্দিরা গরমের ব্যবস্থা ছাড়াই থাকতে বাধ্য হন।
সে সময় নিউইয়র্কের তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস মন্তব্য করেন,
“এমডিসির পরিস্থিতি অগ্রহণযোগ্য ও অমানবিক।”
তিনি আরও বলেন,
“কারাবন্দি হওয়ার অর্থ মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া নয়।”
আইনজীবী এডউইন করদেরো কারাগারটিকে বর্ণনা করেন,
“পৃথিবীতেই নরকের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি” হিসেবে।
২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এখানে অন্তত চারজন বন্দি আত্মহত্যা করেছে বলে ধারণা করা হয়।
⚖️ বিচারকদের অসন্তোষ
কারাগারের এই অবস্থার কারণে কিছু বিচারক সেখানে দণ্ডপ্রাপ্তদের পাঠাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ২০২৪ সালের অগাস্টে বিচারক গ্যারি ব্রাউন জানান, ৭৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে দেওয়া নয় মাসের কারাদণ্ড বাতিল করা হবে, যদি তাকে এমডিসিতে পাঠানো হয়।
তিনি বলেন,
“এই ধরনের সংঘাতের ঘটনাগুলো তখনই ঘটে যখন কর্তৃপক্ষ তদারকি করতে চরম ব্যর্থ।”
👤 অন্যান্য আলোচিত বন্দি
এমডিসিতে আগে বন্দি ছিলেন বা আছেন—
-
হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ
-
মেক্সিকোর সাবেক জননিরাপত্তা সচিব জেনারো গার্সিয়া লুনা
-
মাদক সম্রাট হোয়াকিন ‘এল চাপো’ গুজমান
-
সিনালোয়া কার্টেল নেতা ইসমাইল ‘এল মায়ো’ জামবাডা
-
সংগঠিত অপরাধ জগতের নেতা জন গট্টি
-
আল-কায়েদার কয়েকজন সদস্য
-
র্যাপার ও সংগীত প্রযোজক শন ‘ডিডি’ কম্বস
-
ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েল, স্যাম ব্যাংকম্যান-ফ্রাইড, মাইকেল কোহেন


















