ঢাকার গুলশানে ‘ঘুষ হিসেবে’ একটি ফ্ল্যাট নেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা–এর ভাগনি ও ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক–এর বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিস’ জারির পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ সাব্বির ফয়েজ বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেন।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ হোসেন জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক এ কে এম মর্তুজা আলী সাগর ‘রেড নোটিস’ জারির পদক্ষেপ চেয়ে আবেদন করেন।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, হস্তান্তরযোগ্য নয়—এমন একটি প্লটে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডকে বহুতল ভবন নির্মাণ করে ফ্ল্যাট আকারে বিক্রির সুযোগ করে দেন টিউলিপ সিদ্দিক। এর বিনিময়ে ওই আবাসন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একটি ফ্ল্যাট ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করেন এই ব্রিটিশ এমপি।
মামলা দায়েরের আগেই টিউলিপ সিদ্দিক দেশত্যাগ করেছেন এবং মামলার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে—এমন আলামত ও নথিপত্র নষ্টের চেষ্টা করেছেন বলে আবেদনে বলা হয়। এজন্য তাকে গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন। তবে তিনি বিদেশে অবস্থান করায় তাকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোল–এর মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারি করা জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়।
ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের কাছ থেকে ‘ঘুষ’ হিসেবে ফ্ল্যাট নেওয়ার অভিযোগে গত বছরের ১৫ এপ্রিল টিউলিপ, রাজউকের সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা শাহ মো. খসরুজ্জামান এবং সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা-১ সরদার মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১৯৬৩ সালে তৎকালীন বিচারপতি ইমাম হোসেন চৌধুরী গুলশানে ১ বিঘা ১৯ কাঠা ১৩ ছটাক আয়তনের একটি প্লট (বর্তমান ১১এ ও ১১বি) বরাদ্দ পান। সরকারি লিজ চুক্তি অনুযায়ী, ৯৯ বছরের মধ্যে ওই প্লট হস্তান্তর বা ভাগ করে বিক্রি নিষিদ্ধ ছিল।
তবে ১৯৭৩ সালে তিনি মো. মজিবুর রহমান ভূঁইয়াকে আমমোক্তার করে প্লটটি হস্তান্তর করেন। পরে মজিবুর রহমান ভূঁইয়া প্লটটি ভাগ করে স্ত্রী শামসুন নাহার ও শ্যালিকা জেরিন বেগমের কাছে বিক্রি করেন।
পরবর্তীতে শামসুন নাহার ৫০ লাখ টাকায় প্লটটি বিক্রি করেন ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলামের দুই মেয়ে নাইমা ইসলাম ও কনিতা ইসলামের কাছে। তারা ভবন নির্মাণের জন্য তাদের বাবা জহুরুল ইসলামকে ব্যক্তি হিসেবে আমমোক্তারনামা দেন।
জহুরুল ইসলাম রাজউকের মাধ্যমে প্লটটি দুই ভাগে বিভক্ত করে ছয় তলা ভবন নির্মাণ শুরু করেন। কাজ চলাকালে তার মৃত্যু হয়। পরে দুই বোন তাদের ভাই মঞ্জুরুল ইসলামকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিলেও পারিবারিক বিরোধের কারণে সেটি বাতিল করেন।
মঞ্জুরুল ইসলাম আদালতে মামলা করেন। অন্যদিকে তার দুই বোনও নিজেদের স্বত্ব পুনরুদ্ধারে মামলা করেন। মামলা চলমান অবস্থায় তারা ফ্ল্যাট হস্তান্তরে অনুমতি না দেওয়ার জন্য রাজউকে আবেদন করেন।
দুদকের অভিযোগ, রাজউকের তৎকালীন আইন উপদেষ্টারা দুই দফায় ‘অসত্য তথ্য’ উপস্থাপন করে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডকে ‘অবৈধভাবে’ ফ্ল্যাট হস্তান্তরের অনুমোদন দেন, যদিও প্রতিষ্ঠানটি প্লটের মালিক ছিল না।
লিজ দলিল অনুযায়ী ৯৯ বছরের আগে প্লট হস্তান্তর বা আংশিক বিভাজনের সুযোগ ছিল না। কিন্তু শর্ত অমান্য করে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে’ আমমোক্তার নিয়োগ, প্লট বিক্রি, বিভাজন ও হস্তান্তর করা হয়েছে বলে দুদক জানায়।
দুদকের বক্তব্য, চেয়ারম্যানকে আমমোক্তার নিয়োগের আবেদন করা হলেও দুই পক্ষ উপস্থিত না হওয়ায় তা অনুমোদিত হয়নি।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, প্লটটি ভেঙে দুই ভাগ করে সেখানে ভবন নির্মাণের পর ৩৬টি ফ্ল্যাট বিক্রি বা হস্তান্তর করা হয়। অথচ Individual Person থেকে Legal Person হিসেবে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের মালিকানা হস্তান্তর ছিল ‘প্রশ্নবিদ্ধ’।
দুদক বলছে, নিয়মবহির্ভূতভাবে প্লট বিভাজন ও ৩৬টি ফ্ল্যাট হস্তান্তরের অনুমোদন আদায়ে টিউলিপ সিদ্দিকীর ভূমিকা ছিল। তার খালা শেখ হাসিনা তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ইস্টার্ন হাউজিংকে সুবিধা করে দেওয়ার বিনিময়ে ‘অবৈধ পারিতোষিক হিসাবে বিনে পয়সায়’ একটি ফ্ল্যাট নেওয়া হয়েছে।
‘অবৈধ সুবিধা নেওয়ার প্রমাণ’ হিসেবে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের একটি চিঠির কথা উল্লেখ করেছে দুদক, যেখানে ‘রিজওয়ানা সিদ্দিকী টিউলিপ’-কে বিনামূল্যে একটি ফ্ল্যাট দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রাজউকে পাঠানো ফ্ল্যাট মালিকদের তালিকায় ৫ নম্বরে টিউলিপের নাম ছিল বলে জানিয়েছে দুদক। তাদের দাবি, এটি ‘অবৈধ প্রভাব খাটানোর’ প্রমাণ।
মামলার অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। একই দিনে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)–এর সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা সরদার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।
এর আগে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দে জালিয়াতির তিন মামলায় টিউলিপের দুই বছর করে মোট ছয় বছরের কারাদণ্ড হয়েছে।