ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সকালে তেহরানের একটি সরকারি কমপাউন্ডে বৈঠকে বসবে—এ তথ্য আগে থেকেই জেনে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।
ওই তথ্য যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সরবরাহ করে। তথ্যের ভিত্তিতে ইসরায়েল হামলার সময়সূচি বদলে দিনের আলোতেই আঘাত হানে। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ ডজনখানেক শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানায়, ইসরায়েলি জঙ্গিবিমান খামেনির কমপাউন্ডে ৩০টি বোমা নিক্ষেপ করে, যার ফলে পুরো কমপাউন্ড ধ্বংস হয়ে যায়।
ইসরায়েল সময় শনিবার সকাল ৬টার দিকে অভিযান শুরু হয়। তেহরান সময় সকাল আনুমানিক ৯টা ৪০ মিনিটে—অর্থাৎ জঙ্গিবিমান উড্ডয়নের দুই ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পর—বোমা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
খামেনির অবস্থান সম্পর্কে ‘নির্ভুল’ তথ্য
নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, কয়েক মাস ধরে সিআইএ খামেনির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল এবং তার অবস্থান ও চলাচলের ধরন সম্পর্কে ধীরে ধীরে নিশ্চিত তথ্য পাচ্ছিল।
এর ধারাবাহিকতায় সংস্থাটি জানতে পারে, শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলের একটি কমপাউন্ডে শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং সেখানে খামেনি উপস্থিত থাকবেন।
খামেনির অবস্থান সংক্রান্ত এই ‘উচ্চমাত্রার নির্ভুল তথ্য’ সিআইএ ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, গোয়েন্দারা একই সময়ে তিনটি পৃথক বৈঠকের তথ্য শনাক্ত করেছিলেন। বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছিল ইরানের প্রেসিডেন্সি কার্যালয়, সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কার্যালয়ে।
ইসরায়েলের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল গভীর রাতে হামলা চালানো। তবে দিনের বেলায় বৈঠকের তথ্য পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলার সময় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়।
ইসরায়েলের সাবেক সামরিক গোয়েন্দা প্রধান আমোস ইয়াদলিন ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, “সবাই ধারণা করেছিল, হামলা হবে মধ্যরাতে, অন্ধকারের আড়ালে। গত জুনে ইরানের ওপর আকস্মিক হামলার সূচনাতেও ইসরায়েল রাতেই আঘাত করেছিল। কিন্তু এবার দিনের আলোয় হামলা কৌশলগতভাবে প্রতিপক্ষকে বিস্মিত করেছে।”
শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তারা নিহত
ইসরায়েলের এই হামলায় খামেনির পাশাপাশি আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা প্রাণ হারান।
দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, ইরানের সামরিক পরিষদের প্রধান ও খামেনির শীর্ষ নিরাপত্তা উপদেষ্টা রিয়ার অ্যাডমিরাল আলি শামখানি এবং বিপ্লবী গার্ড কোরের কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েল দাবি করেছে, ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহও নিহত হয়েছেন। বৈঠকে বিপ্লবী গার্ড কোরের অ্যারোস্পেস কমান্ডার সাইয়্যেদ মাজিদ মুসাভি ও ডেপুটি ইনটেলিজেন্স মিনিস্টার মোহাম্মদ শিরাজিসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, তারা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক কর্মকর্তার পাঠানো একটি বার্তা দেখেছে।
সেখানে বলা হয়েছে, “আজ সকালে তেহরানের বিভিন্ন স্থানে সমন্বিত হামলা চালানো হয়েছে, যার একটি স্থানে ইরানের উচ্চপর্যায়ের নেতারা সমবেত হয়েছিলেন।”
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেও কমপাউন্ডে হামলার ক্ষেত্রে ইসরায়েল কৌশলগত চমক দিতে সক্ষম হয়েছে।
হামলার সময় জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কমপাউন্ডের একটি ভবনে অবস্থান করছিলেন, আর খামেনি কাছাকাছি আরেকটি ভবনে ছিলেন।
টার্কি টুডে লিখেছে, অল্প সময়ের মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গভীর গোয়েন্দা নজরদারির সাফল্যকে তুলে ধরে।
একই সঙ্গে এটি ইরানি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টিও প্রকাশ করেছে, যদিও দুই দেশই আগে থেকেই যুদ্ধের প্রস্তুতির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিল।