ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভোট চলাকালে নীরব থাকলেও ফল ঘোষণার পরদিন থেকেই একের পর এক দলীয় কার্যালয় খোলার ঘটনায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় দেড় বছর পর নির্বাচন শেষে ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরা কেন সক্রিয় হচ্ছেন—এই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরছে।
দলীয় নির্দেশে নাকি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারা মাঠে নামছেন—তা নিয়েও জনপরিসরে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা ও নিবন্ধন স্থগিত
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রায় নয় মাস পর, গত বছরের ১০ মে বিক্ষোভের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দেয়। দলটির নিবন্ধন স্থগিত হওয়ায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগও বন্ধ হয়ে যায়।
এর আগে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়।
নিষেধাজ্ঞার পর বিভিন্ন সময়ে কর্মসূচি ও ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা দেখা গেলেও কার্যালয় খুলে জাতীয় পতাকা উত্তোলন বা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান–এর ছবি টানানোর ঘটনা আর ঘটেনি।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে ইউনূস সরকার বিদায় নেয়। আওয়ামী লীগ ছাড়া এই নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৬৮ আসন পেয়ে বিরোধী দলে বসে জামায়াত।
আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক টানতে বিএনপি ও জামায়াত-ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলোর তৎপরতার খবরও গণমাধ্যমে আসে।
পঞ্চগড় থেকে কার্যালয় খোলা শুরু
১৩ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড় সদর উপজেলায় তালাবদ্ধ আওয়ামী লীগ কার্যালয় খোলা হয়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিএনপি নেতা আবু দাউদ প্রধানের উপস্থিতিতে তালা খোলার দৃশ্য দেখা যায়।
ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান বলেন, “...আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রাণের যে সংগঠন, আমাদের চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগকে তিনি আজকে অবমুক্ত করেছেন।”
পরে ঠাকুরগাঁও, বরগুনা, পাবনা, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের ঘটনা ঘটে। কোথাও জাতীয় পতাকা উত্তোলন, কোথাও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়।
‘স্বতঃস্ফূর্ত’ উদ্যোগের দাবি
পাবনায় কার্যালয় খোলায় অংশ নেওয়া ছাত্রলীগ নেতা তৌশিকুর রহমান বলেন, “আমরা নিজেদের মতো আলোচনা করেছি... নিজেদের স্বতঃস্ফূর্ততাতেই সবাই গিয়ে খুলে ফেললাম।”
তিনি আরও বলেন, “শুক্রবার পার্টি অফিস খোলার পরদিন কয়েকজন লোক আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য আগুন দিয়ে চলে যায়...”
নেতাকর্মীদের দাবি, ‘মব’ সহিংসতা কমেছে এবং রাজনৈতিক পরিবেশ এখন আগের চেয়ে স্বাভাবিক।
কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও ৩২ নম্বর
সরকার পতনের পর গুলিস্তানের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবন এবং সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়।
নির্বাচনের দুইদিন পর কয়েকজন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে স্লোগান দেন। যুব মহিলা লীগের নেত্রী এম বি কানিজ বলেন, “...এখন অন্তত মব সন্ত্রাসীরা নাই। রাজনীতির পরিবেশটা অন্তত সুন্দর হবে।”
যা বলছেন বাহাউদ্দিন নাছিম
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাছিম বলেন, “দখলদার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের পরে নেতাকর্মীদের ভিতরে একটা স্বস্তি এসেছে...”
তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুর উপর যে আঘাত এসেছে... এই বিশ্বাস থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নেতাকর্মীরা ঘরে ফিরে যাচ্ছে।”
তার ভাষায়, আওয়ামী লীগ একটি ‘গণতান্ত্রিক’ দল এবং তাদের সাংবিধানিক অধিকার ফিরবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে।
বিএনপির অবস্থান
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “যেহেতু আইনগতভাবে বলা আছে যে, তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেইভাবে এটাকে দেখা হবে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান বলেন, “বিএনপি একটি উদারনৈতিক রাজনৈতিক দল; আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না।”
পুলিশের সতর্কতা
পুলিশের সদ্য সাবেক আইজি বাহারুল আলম মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, “কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো ধরনের তৎপরতা চলতে দেওয়া যাবে না। কেউ বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।”