অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর–কে অপসারণ করে ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। পোশাক খাতের উদ্যোক্তা মোস্তাকুর রহমান পূর্বে পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউজ এবং আবাসন খাতেও সম্পৃক্ত ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ বা আমলা নন—এমন কোনো ব্যক্তিকে এই প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর করা হলো। ফলে আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট অনেকের মধ্যেই বিস্ময় তৈরি হয়েছে।
চার বছরের জন্য তাকে গভর্নর নিয়োগ দিয়ে বুধবার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী প্রশাসন ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছিল। তার সময়েই ব্যাংকিং খাতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়।
দেড় বছর পর তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তার অবশিষ্ট নিয়োগকাল বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান হেরা সোয়েটার গার্মেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। ১৯৬৬ সালে ঢাকায় তার জন্ম। তার গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার জামপুর ইউনিয়নে। তার বড় ভাই মো. মোস্তাফিজুর রহমান মামুন থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ১৯৯১ সালে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে এফসিএমএ ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে করপোরেট ফিন্যান্স, রপ্তানি, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কাজ করছেন।
কোনো বড় ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে না থাকলেও পেশাজীবী হিসেবে বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য ছিলেন মোস্তাকুর রহমান। পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)–এর বাংলাদেশ ব্যাংক–সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি গত বছরের জুলাই থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী যখন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ–এর সভাপতি ছিলেন, তখন ১৯৯৮ থেকে ২০০০ মেয়াদে ওই স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদ সদস্য ছিলেন মোস্তাকুর রহমান।
এমআরএম সিকিউরিটিজ নামের একটি ব্রোকারেজ হাউজের প্রতিনিধিত্ব করে তিনি সিএসই বোর্ডে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে দুই দফা মালিকানা পরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় ইউসিবি ব্রোকারেজ হাউজ।
মোস্তাকুর রহমান আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাব, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)–এর সদস্য। এসব সংগঠনের বিভিন্ন কমিটিতেও তিনি কাজ করেছেন।
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় যা বললেন নতুন গভর্নর
ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব শুরু করতে চান নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। পাশাপাশি সুদের হার হ্রাসের বিষয়টিও তার অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানান তিনি।
গভর্নর হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে তার ভাবনা জানতে চাইলে মোস্তাকুর রহমান বলেন,
“আসলে জানেনইতো অর্থনীতির অবস্থা, ব্যাংকিং খাতের অবস্থা। তাই এই সময়টায় এই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করায়তো ‘একটা চ্যালেঞ্জ আছে’। ইনশাল্লাহ, আগে ব্যাংকে বসি। সবার সাথে আলোচনা করি। আশা করি সবার সহযোগিতা নিয়ে প্রধান কাজটা হবে- আগে ‘ট্রাস্ট বিল্ডিং’ ব্যাংকিং খাতে। শৃঙ্খলা আরও ফিরায়ে নিয়ে আসা। নিশ্চয়ই আগের গভর্নর (আহসান এইচ মনসুর) অনেকখানি নিয়ে আসছে, আরও নিয়ে আসা।”
তিনি আরও বলেন, “আরেকটা হচ্ছে আমাদের যেটা প্রধান থাকবে যে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য করে আমাদের অর্থনীতিকে যতটুকু রান করা যায়। আপনি জানেন যে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে আসছে, তাই না? তো, এরজন্য চেষ্টা করা- সুদের হারকে কমায়ে নিয়ে আসা। এই কাজগুলো করা।”