ইরানের ভেতর টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা তীব্র বিক্ষোভ ও দীর্ঘদিনের বাইরের চাপ সত্ত্বেও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির ক্ষমতাবান নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠীর মধ্যে এমন কোনো ভাঙনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না, যা থেকে মনে হতে পারে দেশটির শাসনব্যবস্থা পতনের মুখে রয়েছে।
শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশটির শাসকদের ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অভিযানের জবাবে ইরানে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি অব্যাহত রেখেছেন। গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান নিয়ে ‘সব ধরনের বিকল্পই খোলা’ রয়েছে বলে ট্রাম্পের অবস্থান—এ তথ্য হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন।
তবে সড়কের প্রতিবাদ এবং আন্তর্জাতিক চাপ—এ দুটি বিষয় যদি নেতৃত্বের ভেতরের কোনো অংশকে অবস্থান পরিবর্তনে না ঠেলে দেয়, তাহলে গুরুতরভাবে দুর্বল হয়েও ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে বলেই মনে করেন মধ্যপ্রাচ্যের দুই সরকারি সূত্র ও দুইজন বিশ্লেষক।
বিক্ষোভে প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে এক ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন। তিনি বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা সদস্যদের হত্যার জন্য ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেছেন। এর আগে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছিল, চলমান বিক্ষোভে অন্তত ৬০০ মানুষ নিহত হয়েছে।
বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী ও বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে ইরানে বহুস্তরীয় যে নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠেছে, কেবল বাইরের চাপ দিয়ে তা নড়বড়ে করা যাবে না—অভ্যন্তরীণ বিভাজন না হলে তেহরানকে দমানো কঠিন হবে বলেই মনে করেন ইরানি-আমেরিকান গবেষক এবং আঞ্চলিক সংঘাত ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর।
বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী ও বাসিজের মোট সদস্যসংখ্যা মিলিয়ে প্রায় দশ লাখের কাছাকাছি বলে ধারণা দেওয়া হয়।
তিনি বলেছেন, “এ ধরনের পরিস্থিতিতে সফল হতে হলে আপনাকে দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় জনসমাগম বজায় রাখতে হবে। রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে ভাঙন ধরাতে হবে। বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু অংশকে পক্ষত্যাগে রাজি করাতে হবে।”
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এর আগে বহুবার এমন অস্থিরতার ঢেউ মোকাবিলা করেছেন। ২০০৯ সালের পর দেশটিতে এটি পঞ্চম বৃহৎ দাঙ্গা ও বিক্ষোভ। এতে প্রমাণ করে, গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যেও সরকার স্থিতিশীলতা ও ঐক্য ধরে রাখতে পারছে—মন্তব্য করেছেন মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের পল সালেম।
পরিস্থিতির বদল ঘটাতে হলে বিক্ষোভের শক্তি এমন হতে হবে, যা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন বহু বিষয়কে ছাড়িয়ে যেতে পারে। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, মোল্লাতন্ত্রের প্রতি অনুগত বড় জনগোষ্ঠী এবং ৯ কোটি মানুষের এ দেশের বিস্তৃত ভূখণ্ড ও জাতিগত বৈচিত্র্যও বিবেচনায় নিতে হবে, বলেছেন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আয়ার।
তবে টিকে থাকা মানেই যে এ ব্যবস্থা স্থিতিশীল—তা নয়, বিশ্লেষকদের এমনই মত।
ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি ১৯৭৯ সালের পর অন্যতম বড় সংকটের মুখোমুখি। বহুস্তরীয় নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি এমন চাপে আছে যে উদ্ধারপথ স্পষ্ট নয়। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপের অপেক্ষায়, পারমাণবিক কর্মসূচিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, লেবানন–সিরিয়া–গাজায় তাদের ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ মিত্ররাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
নাসর মন্তব্য করেন, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি এখনই ‘পতনের দ্বারপ্রান্তে’—এ কথা তিনি মনে করেন না, তবে তারা এমন এক অবস্থায় ঢুকে পড়েছে, যেখান থেকে ‘আগানো অত্যন্ত কঠিন’ হবে।
জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে গত ২৮ ডিসেম্বর শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে চলমান বিক্ষোভ শুরু হয়, পরে তা মোল্লাতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। দমনাভিযানের ফলে রাজনৈতিকভাবে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির যে বৈধতা ছিল, তা আরও ক্ষয় হয়েছে বলে মত দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত তারা বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা সদস্য মিলিয়ে ৫৭৩ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। গ্রেপ্তার হয়েছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ।
ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হতাহত বা গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রকাশ করেনি, আর রয়টার্সও এসব সংখ্যার স্বাধীন যাচাই করতে পারেনি।
সবার দৃষ্টি এখন ট্রাম্পের দিকে
বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে—ট্রাম্পের এমন হুমকি পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করেছে।
মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানি বিক্ষোভকারীদের প্রতিষ্ঠান দখলে উৎসাহ দিয়ে বলেন, ‘সাহায্য পথে রয়েছে’। ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক বাতিলের কথাও জানান তিনি। এর আগে তিনি শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। চীন তেহরানের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার।
শনিবার টেলিফোন আলাপে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন সিনেটর মার্কো রুবিও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে আলাপটির সঙ্গে যুক্ত এক ইসরায়েলি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে।
বিশ্লেষক পল সালেমের মতে, বিক্ষোভ নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ আদর্শগতের চেয়ে কৌশলগত বেশি।
তার ভাষায়, লক্ষ্য হতে পারে রাষ্ট্রকে এতটাই দুর্বল করা, যার সুযোগ নিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে লাগাম টানার মতো ছাড় আদায় করা যায়।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস রয়টার্সকে কোনো উত্তর দেয়নি। তবে দপ্তরটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ‘যা বলেন তা করতে পারেন’—এ কথা ইরান ও ভেনেজুয়েলায় সামরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই তিনি দেখিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কিছু রাজনৈতিক মহলে ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ ইরানে প্রয়োগের আগ্রহ বাড়ছে বলে মত দিয়েছেন এক কূটনীতিক ও তিন বিশ্লেষক। এতে লক্ষ্য হবে শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে রাষ্ট্রের বাকি স্তরগুলোর কাছে ইঙ্গিত দেওয়া—ক্ষমতায় থাকতে চাইলে সহযোগিতা করতে হবে।
যদিও ইরানের ক্ষেত্রে এ মডেল বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলেই ধারণা। দীর্ঘ দশক ধরে গড়ে ওঠা নিরাপত্তা কাঠামো, প্রতিষ্ঠানগত ঐক্য, বিস্তৃত ভূখণ্ড ও জাতিগত বৈচিত্র্য বড় প্রতিবন্ধক।
দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা ও দুই বিশ্লেষক রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বিদেশি সামরিক পদক্ষেপ ইরানের জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও ঘনীভূত করতে পারে, বিশেষ করে কুর্দি ও সুন্নি বালুচ অধ্যুষিত অঞ্চলে, যেখানে প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস আছে।
আরও একটি সীমাবদ্ধতা হলো—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে অন্যত্র ব্যস্ত। তবে প্রয়োজনে দ্রুতই তা সরানো সম্ভব বলে মনে করেন কূটনীতিকরা।
থিংক ট্যাঙ্ক ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ডেভিড ম্যাকোভস্কির ধারণা, ট্রাম্প যদি কোনো ব্যবস্থা নেন, তা দীর্ঘ যুদ্ধ নয়—বরং দ্রুত ও হঠাৎ নেওয়া পদক্ষেপই হবে। সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে দেখা গেছে, স্থল সেনা না পাঠিয়ে পরিস্থিতির মোড় ঘোরাতে পারে—এমন পদক্ষেপ নিতেই তিনি বেশি আগ্রহী।
তিনি বলেন, “তিনি এমন কিছু খুঁজছেন যা গেম চেঞ্জার হতে পারে, কিন্তু সেটা ঠিক কী—এটাই প্রশ্ন।”
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সামনে সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রপথে ইরানি তেল পরিবহনে বাধা সৃষ্টি, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সামরিক বা সাইবার হামলা। তবে প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গেই বড় ঝুঁকি জড়িত।
বলপ্রয়োগ ছাড়াও কিছু পথ খোলা থাকতে পারে—যেমন বিক্ষোভকারীদের যোগাযোগ সচল রাখতে স্টারলিংকের মাধ্যমে ইরানে ইন্টারনেট পুনঃস্থাপন।
রয়টার্স জানতে চাইলে ট্রাম্প কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন—এ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করেনি হোয়াইট হাউস ও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ম্যাকোভস্কি বলেন, “ট্রাম্প কখনো কখনো হুমকিকে ব্যবহার করেন সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে, কখনো প্রতিপক্ষকে দূরে রাখতে, আবার কখনো ইঙ্গিত দিতে যে তিনি সত্যিই হস্তক্ষেপের প্রস্তুতিতে আছেন। এখন কোনটি প্রযোজ্য—তা আমরা জানি না।”



















