মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ১৫তম দিনে এসে ইরানের জ্বালানি খাতের ‘হৃদপিণ্ড’ হিসেবে পরিচিত Kharg Island-এ বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মাত্র ২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ছোট দ্বীপটি ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। শুক্রবারের (১৩ মার্চ) হামলার পর পুরো অঞ্চলেই তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
ছোট দ্বীপ, কিন্তু বিশাল গুরুত্ব
পারস্য উপসাগরের উত্তরে Bushehr Province-এর মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পাথুরে দ্বীপটির দৈর্ঘ্য প্রায় আট কিলোমিটার এবং প্রস্থ প্রায় পাঁচ কিলোমিটার।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump একে ইরানের ‘মুকুট মণি’ বলে উল্লেখ করলেও ইরানি লেখক Jalal Al-e-Ahmad বহু বছর আগে একে পারস্য উপসাগরের ‘অনাথ মুক্তা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
দ্বীপটির তেল সংরক্ষণাগার, লোডিং টার্মিনাল ও পাইপলাইনগুলো ইরানের তেল খাতের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
এই টার্মিনালে তিনটি বড় অফশোর ক্ষেত্র— Abuzar Oil Field, Forouzan Oil Field এবং Doroud Oil Field থেকে অপরিশোধিত তেল আসে।
এ ছাড়া ইরানের বৃহৎ তেলক্ষেত্র— Ahvaz Oil Field, Marun Oil Field এবং Gachsaran Oil Field থেকেও পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি তেল আসে এখানে। এখান থেকেই বছরে প্রায় ৯৫ কোটি ব্যারেল তেল রপ্তানি করা হয়।
অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ
Royal United Services Institute-এর জ্বালানি গবেষক Petras Katinas এক আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাকে বলেন, ইরান সরকারের অর্থায়ন এবং সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য খার্ক দ্বীপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, এই দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ হারালে ইরানের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তেল স্থাপনার পাশাপাশি দ্বীপটিতে সপ্তম শতাব্দীর মীর মোহাম্মদের মাজারসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং ১৭৪৭ সালের একটি ডাচ দুর্গের ধ্বংসাবশেষও রয়েছে।
কেন এই হামলা
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্বীপটির লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে। সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, “আমি দ্বীপটির তেল অবকাঠামো এখনই পুরোপুরি ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে ইরান বা অন্য কেউ যদি Strait of Hormuz দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়, তাহলে আমি সঙ্গে সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব।”
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বর্তমানে ইরানের কারণে প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে পৌঁছেছে।
Organization of the Petroleum Exporting Countries-এর চতুর্থ বৃহত্তম তেল উৎপাদক দেশ ইরান ঘোষণা দিয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে পারস্য উপসাগর থেকে ‘এক লিটার তেলও’ রপ্তানি করতে দেওয়া হবে না।
মার্কিন নৌবাহিনীর প্রস্তুতি
মার্কিন সংবাদমাধ্যম The Wall Street Journal ও The New York Times জানিয়েছে, পেন্টাগন জাপানে মোতায়েন থাকা উভচর যুদ্ধজাহাজ USS Tripoli (LHA-7)-কে এই অঞ্চলে পাঠিয়েছে।
এই জাহাজে প্রায় আড়াই হাজার নৌসেনা রয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটি দখলের চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
তীব্র প্রতিশোধের আশঙ্কা
খার্ক দ্বীপে হামলার ফলে ইরানের তেল রপ্তানি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান JPMorgan Chase সতর্ক করেছে, এর জেরে হরমুজ প্রণালি বা আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরান ‘ভয়াবহ প্রতিশোধ’ নিতে পারে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার Mohammad Bagher Ghalibaf আগেই সতর্ক করে বলেছেন, দ্বীপগুলোতে হামলা হলে ইরান ‘সব ধরনের সংযম’ ত্যাগ করবে। তার মতে, এতে যদি মার্কিন সেনাদের রক্ত ঝরে, তবে তার দায় ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই নিতে হবে।
আরও পড়ুন: