ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁও সীমান্ত এলাকা থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মী ওসমান শরীফ হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করার তথ্য দিয়েছে রাজ্য পুলিশ।
প্রায় আড়াই মাস আগে ঢাকার পুলিশ তাদের ভারতে অবস্থানের কথা বললেও সে সময় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তা জোরালোভাবে অস্বীকার করেছিল।
আগে ভারতে অবস্থানের দাবি করেছিল ডিএমপি
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ১৬ দিন পর ২৮ ডিসেম্বর জানায়, মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম এবং তার সহযোগী মোটরসাইকেল চালক আলমগীর হোসেন ভারতের মেঘালয়ে অবস্থান করছেন।
তবে ওই দাবি প্রকাশের পর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সেসময় স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে ফয়সাল তাদের দেশে নেই।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে গ্রেপ্তারের তথ্য
অবশেষে রোববার (৮ মার্চ) ভারতের সংবাদমাধ্যম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্সের (এসটিএফ) বিজ্ঞপ্তির বরাতে ফয়সাল ও আলমগীর গ্রেপ্তার হওয়ার খবর প্রকাশ করে।
ওই বিজ্ঞপ্তির তথ্য উল্লেখ করে বার্তা সংস্থা এএনআই জানায়, শনিবার রাতে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁ এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান
এসটিএফ জানিয়েছে, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। পুলিশের কাছে এমন তথ্য ছিল যে দুই বাংলাদেশি ব্যক্তি চাঁদাবাজি ও হত্যাসহ গুরুতর অপরাধ করে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছেন।
তারা সুযোগ পেলে বাংলাদেশে ফেরার উদ্দেশ্যে বনগাঁ সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
এসব তথ্য পাওয়ার পর শনিবার গভীর রাতে বনগাঁ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ফয়সাল ও আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে যা জানা গেছে
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যের বরাতে এসটিএফ জানিয়েছে, ফয়সাল করিম ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মী ওসমান হাদিকে হত্যা করে ভারতে পালিয়ে যান।
মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে তারা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেন এবং বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করার পর আবার বাংলাদেশে ফেরার উদ্দেশ্যে বনগাঁ সীমান্তে যান।
আদালতে হাজির ও পুলিশ হেফাজত
এসটিএফ জানিয়েছে, এ ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। রোববার তাদের আদালতে হাজির করার পর পুলিশ হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্কের প্রেক্ষাপট
চব্বিশের আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে শীতল হয়ে আসা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যখন পরিবর্তনের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে, ঠিক তখনই প্রতিবেশী দেশ থেকে এই দুজনকে গ্রেপ্তারের খবর সামনে এল।
ডিএমপির প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, “আমরা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়টা জেনেছি। এখন যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানার চেষ্টা করছি।”
হাদির ওপর হামলার ঘটনা
বাংলাদেশে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে গুলিবিদ্ধ হন ওসমান হাদি।
একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মোটরসাইকেলে করে দুই ব্যক্তি এসে কাছ থেকে হাদির মাথায় গুলি করেন। পরে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।
ওই ভিডিওর ভিত্তিতে পুলিশ দাবি করে, অটোরিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করার সময় মোটরসাইকেলের পেছনে ছিলেন ফয়সাল এবং মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন আলমগীর।
হত্যাকাণ্ড ঘিরে উত্তেজনা
ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় সেসময় দেশে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনার জন্য ভারতকে দায়ী করে বিক্ষোভও হয়। ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশন অভিমুখে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে গোলযোগের ঘটনাও ঘটে। তখন দাবি করা হয়েছিল, হামলাকারীরা ভারতে পালিয়ে গেছেন।
মৃত্যুর পর বিক্ষোভ
সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাদি মারা যাওয়ার পর বাংলাদেশজুড়ে বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশে ভারতীয় হাই কমিশন ও সহকারী হাই কমিশনের সামনে এবং ভারতে বাংলাদেশের হাই কমিশন ও উপ হাই কমিশনের সামনে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারের বক্তব্য
আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল ও আলমগীর গ্রেপ্তারের খবর সামনে আসার পর রোববার সন্ধ্যায় ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন,
“ওরা আমাদেরকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। তবে আমিতো জানতাম যে ওরা ভারতে গেছে। যথেষ্ট প্রমাণ হাতে নিয়েই আমি কথা বলেছি। এমনকি ওদের একটা রাজ্য পুলিশও আমাদের সহায়তা করেছিল তখন।”
আগের সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের দাবি
এই পুলিশ কর্মকর্তাই গত ২৮ ডিসেম্বর ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের পরপরই ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর সীমান্ত পার হয়ে মেঘালয়ে যান।
তাদের সহায়তার অভিযোগে মেঘালয় পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলেও তিনি জানান।
সেদিন তিনি বলেন, “ফয়সাল ও আলমগীর প্রথমে ঢাকা থেকে সিএনজিতে করে আমিনবাজারে যান। সেখান থেকে মানিকগঞ্জের কালামপুরে এবং পরে প্রাইভেট কারে করে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পৌঁছান।
“সেখানে ফিলিপ নামে একজন তাদের সীমান্ত পার করে পুত্তি নামে একজনের কাছে হস্তান্তর করে। এরপর সামি নামে আরেক ট্যাক্সিচালকের কাছে তাদের দেওয়া হয়। সামি তাদেরকে মেঘালয়ের তুরা শহরে পৌঁছে দেয়।”
পুলিশ কর্মকর্তা নজরুল তখন আরও বলেছিলেন, “অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে আমরা মেঘালয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছি, সেখানে তারা পুত্তি ও সামিকে গ্রেপ্তার করেছে।”
ভারতের পক্ষ থেকে অস্বীকার
তবে ওই সংবাদ সম্মেলনের প্রায় দুই ঘণ্টা পরই ফয়সালের ভারতে অবস্থান ও গ্রেপ্তারের বিষয়টি অস্বীকার করে বিএসএফ ও মেঘালয় পুলিশ।
মেঘালয় পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তার বরাতে সেদিন হিন্দুস্তান টাইমস জানায়,
“বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। প্রতিবেদনে উল্লেখিত অভিযুক্তদের কাউকেই গারো পাহাড়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং কোনো গ্রেপ্তারও করা হয়নি।”
গোয়েন্দা তথ্য না থাকার দাবি
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হাদি হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ফয়সাল ও আলমগীর সীমান্ত পার হয়েছেন বা পুত্তি ও সামি নামে দুজন তাদের সহযোগিতা করেছেন—এমন কোনো গোয়েন্দা তথ্য বা সরেজমিন প্রমাণ নেই।
পরিচয় নিয়ে সন্দেহ
মেঘালয় পুলিশের ওই কর্মকর্তার বরাতে আরও বলা হয়, “পুত্তি বা সামি নামে কাউকে মেঘালয়ের কোথাও শনাক্ত করা যায়নি। ধারণা করা যায়, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো ভেরিফিকেশন বা সমন্বয় ছাড়াই এই বিবরণ তৈরি করা হয়েছে।”
ফয়সালের ভিডিও বার্তা
ওই সময় ফয়সাল করিম একাধিক ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন।
ভিডিওতে তিনি আরব আমিরাতের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসার ছবিও দেখান।
শেষ পর্যন্ত ভারতের গ্রেপ্তার
তবে শেষ পর্যন্ত ভারত থেকেই ফয়সাল করিমের গ্রেপ্তারের তথ্য সামনে আসে।
এসটিএফের চূড়ান্ত তথ্য
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের পর তারা বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে এবং পরে বাংলাদেশে ফেরার উদ্দেশ্যে বনগাঁ সীমান্ত এলাকায় আসে।
গোপন তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার রাতে এসটিএফ অভিযান চালিয়ে রাহুল ওরফে ফয়সাল করিম মাসুদ (৩৭) এবং আলমগীর হোসেনকে (৩৪) গ্রেপ্তার করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, ফয়সাল ও আলমগীর মিলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মী ওসমান হাদিকে হত্যা করে পালিয়ে যান।