যুক্তরাজ্যে শিশুদের স্মার্টফোনে নগ্ন বা অশ্লীল ছবি প্রতিরোধে অ্যাপল ও গুগলকে আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আনতে যাচ্ছে দেশটির সরকার। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে আলোচনা কোনো সমঝোতায় না পৌঁছানোয় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
আন্ডার-১৬ বছর বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন এই আইনি উদ্যোগের ফলে সিলিকন ভ্যালির অন্যতম প্রভাবশালী দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে যাচ্ছে।
সংসদে ঘোষণা
ডিজিটাল, কালচার, মিডিয়া অ্যান্ড স্পোর্ট বিষয়ক সেক্রেটারি অব স্টেট লিসা ন্যান্ডি জানিয়েছেন, আন্ডার-১৮ বছর বয়সীরা যেন তাদের ডিভাইসে নগ্ন ছবি তুলতে, শেয়ার করতে বা দেখতে না পারে, সে লক্ষ্যে একটি পার্লামেন্ট আইন প্রণয়নের কাজ শুরু করবে সরকার।
স্মার্টফোন বাজারে আধিপত্য বিস্তারকারী অপারেটিং সিস্টেমের মালিক গুগল ও অ্যাপলের সঙ্গে আলোচনার জন্য নির্ধারিত তিন মাসের সময়সীমা মঙ্গলবার শেষ হলেও কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি।
হাউস অব কমন্সে ন্যান্ডি বলেন, প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে এখনো একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে, তবে যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন প্রায় অবধারিত হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগুলো থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, আর ক্ষতি যখন এখনই হচ্ছে, তখন তাদের প্রয়োজনীয় গতিতে অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে বলে সন্দেহের সুযোগ দিতে তিনি প্রস্তুত নন।
ডিভাইসেই সুরক্ষা যুক্ত থাকবে
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, এই সুরক্ষাব্যবস্থা ডিভাইসেই যুক্ত থাকবে এবং ডিফল্টভাবে চালু থাকবে। নগ্ন ছবি তোলা, দেখা বা পাঠানোর আগে ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করতে বাধ্য থাকবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। শিশুদের ব্যবহৃত অ্যাপগুলোর ক্ষেত্রেও এই বিধিনিষেধ প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, যার জন্য পৃথক আইন প্রয়োজন হবে।
ন্যান্ডি বলেন, এই উদ্যোগ পুরো প্রযুক্তি-বাস্তুতন্ত্রে পরিবর্তন আনবে এবং অনলাইনে শিশুরা সবচেয়ে বেশি যেভাবে নির্যাতন বা গ্রুমিংয়ের শিকার হয়, সেই পথগুলো বন্ধ করবে।
আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে জ্ঞাত সূত্রগুলো জানিয়েছে, উভয় পক্ষের সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ্রহ থাকলেও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে গোপনীয়তা-সংক্রান্ত উদ্বেগসহ উল্লেখযোগ্য কিছু বাধা এখনো রয়ে গেছে।
শিশু নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিক্রিয়া
লেবার এমপি ও সাবেক সেফগার্ডিং মন্ত্রী জেস ফিলিপস বলেন, এই আইন যুক্তরাজ্যে শিশুদের প্রতারিত বা প্ররোচিত করে নিজেদের অশ্লীল ছবি শেয়ার করানোর মাধ্যমে তৈরি হওয়া কনটেন্ট ঠেকাতে সহায়ক হবে। তবে তিনি সরকারকে আহ্বান জানান, অন্যান্য দেশও যেন যুক্তরাজ্যের পথ অনুসরণ করে, তা নিশ্চিত করতে, যাতে দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাজ্যকে একা এই পথে না থাকতে হয়।
শিশু নির্যাতনমূলক কনটেন্টের অনলাইন বিস্তার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশনের নীতিবিষয়ক প্রধান হানা সোয়ির্সকি বলেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক, তবে সরকার এখন সিদ্ধান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে তারা সন্তুষ্ট।সংস্থাটি জানিয়েছে, গত বছর তাদের নথিভুক্ত করা সংশ্লিষ্ট কনটেন্টের এক-চতুর্থাংশই ছিল স্ব-উৎপাদিত, যা ১২ মাসে ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি কনটেন্টের সমান।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শেষ উদ্যোগগুলোর একটি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের শেষ দিকের সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল অ্যাপল ও গুগলকে তাদের হার্ডওয়্যারে বিল্ট-ইন ফিচার বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত সমাধান চালু করে আন্ডার-১৮ বছর বয়সীদের নগ্ন ছবি তৈরি, পাঠানো বা দেখা বন্ধ করতে তিন মাস সময় বেঁধে দেওয়া। অ্যাপলের আইওএস ও গুগলের অ্যান্ড্রয়েড—এই দুটি অপারেটিং সিস্টেমই বিশ্বের মোবাইল ফোন বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে আছে।
নগ্নতা প্রতিরোধের এই ব্যবস্থায় 'ক্লায়েন্ট-সাইড স্ক্যানিং' প্রযুক্তির ব্যবহার জড়িত থাকতে পারে, যেখানে কনটেন্ট এনক্রিপ্ট বা পাঠানোর আগেই ডিভাইসে থাকা সফটওয়্যার দিয়ে তা স্ক্যান করা হয়।
কিংস কলেজ লন্ডনের সাইবার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বিষয়ক ভিজিটিং সিনিয়র রিসার্চ ফেলো লুকাশ ওলেনিক বলেন, ক্লায়েন্ট-সাইড স্ক্যানিং তুলনামূলক কম ক্ষতিকর পন্থা হলেও এর মাধ্যমে বার্তার কনটেন্ট স্ক্যান করার একটি অবকাঠামো তৈরি হয়ে যায়।
গোপনীয়তাবিষয়ক প্রচারকারীরা সতর্ক করেছেন, প্রাপ্তবয়স্করাও নগ্নতা-প্রতিরোধী ফিচার বন্ধ করতে চাইলে তাদের বয়স যাচাই করাতে হবে। জুন মাসে সরকার জানিয়েছিল, যেসব প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারী নিজেদের বয়স যাচাই করবেন, তাদের ব্যবহৃত ডিভাইসে এই প্রস্তাবের কোনো প্রভাব পড়বে না।
গুগল ও অ্যাপলের প্রতিক্রিয়া
গুগল জানিয়েছে, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় তারা সন্তুষ্ট এবং গোপনীয়তা ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ রক্ষা করে শিশুদের নিরাপদ রাখতে আইনপ্রণেতা, বিশেষজ্ঞ, অ্যাপ ডেভেলপার ও ডিভাইস নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করতে পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অ্যাপলের একজন মুখপাত্র জানান, তারা তাদের 'কমিউনিকেশন সেফটি' ফিচার আরও শক্তিশালী করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা শিশুরা নগ্ন ছবি বা ভিডিও পাঠানো বা গ্রহণ করার সময় তাদের সতর্ক করে। অ্যাপল আরও জানায়, অনলাইনে শোষণ ও নির্যাতন প্রতিরোধে যুক্তরাজ্যের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তারাও একমত এবং শিশুদের নিরাপদ রাখতে কমিউনিকেশন সেফটিসহ অন্যান্য টুল আরও শক্তিশালী করার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
-
বিরল ক্যানসারে আক্রান্ত বিবিসির পরিচিত মুখ মরিয়ম মোশিরি
-
বেনিফিটভুক্ত অভিভাবকদের সন্তানরা আর পাবে না প্রি-স্কুলে অগ্রাধিকার
-
ডিসএবিলিটি বেনিফিট কমানোর বিপক্ষে অধিকাংশ ব্রিটিশ, বলছে নতুন জরিপ
-
রাজপ্রাসাদের চিঠিতে ক্ষুব্ধ হ্যারি-মেগান, HRH খেতাব স্থগিতই থাকছে
-
চাপের মুখেও অনড় মিলিব্যান্ড, ইসরাইলি বসতির পণ্যে নিষেধাজ্ঞার পথে যুক্তরাজ্য