অ্যাপলের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নেওয়ার দ্বিতীয় সপ্তাহেই আইফোনের প্রায় ২০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন উন্মোচন করলেন জন টার্নাস। টিম কুকের বিদায়ের পর অ্যাপলের শীর্ষ পদে আসা টার্নাস বুধবার কোম্পানির বার্ষিক পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে মঞ্চে হাজির হন কোম্পানির প্রথম ফোল্ডেবল আইফোনের বিশাল ছবির সামনে।
বই-এর মতো ভাঁজ করা নকশার নতুন এই আইফোনের নাম দেওয়া হয়েছে 'ডুয়ো'। এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আকৃতির আইফোন, এবং দামের দিক থেকেও সবচেয়ে ব্যয়বহুল-শুরুর দাম ২ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ১ হাজার ৪৭৫ পাউন্ড), যা সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
টার্নাস জানান, 'ডুয়ো' তৈরির অনুপ্রেরণা এসেছে আইপ্যাড থেকে, আর এর ভাঁজ করার প্রযুক্তিকে তিনি সাবলীল ও সহজবোধ্য বলে বর্ণনা করেন। ফোনটি খোলা অবস্থায় দেখতে ছোট আইপ্যাডের মতো, আর ভাঁজ করলে দেখতে লাগে প্রশস্ত আইফোনের মতো। এর আগে সর্বশেষ আইফোনের সর্বোচ্চ শুরুর দাম ছিল ৯০০ ডলার-অর্থাৎ 'ডুয়ো'র দাম প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেশি।
বিশ্বজুড়ে টিনএজারদের ক্রেজ, কিন্তু সবার নাগালে নেই
আইফোন এখন শুধু একটি ফোন নয়-বিশেষ করে টিনএজার ও তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি একরকম সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। উন্নত দেশগুলোতে গড় আয়ের মানুষ কয়েক দিনের বেতনেই এই স্বপ্নের ফোন হাতে পেতে পারেন। কিন্তু অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন-সেখানে আইফোন যেন 'স্বাদ আছে, সাধ্য নাই'-এর এক জীবন্ত উদাহরণ।
প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেনস্কোপের 'আইফোন অ্যাফোর্ডেবিলিটি ইনডেক্স' অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে একজন গড় আয়ের কর্মীর আইফোন ১৭ প্রো কিনতে মাত্র চার দিনের বেতন প্রয়োজন হয়, আর সুইজারল্যান্ড ও লাক্সেমবার্গে সময় লাগে মাত্র তিন দিন। অথচ ভারতে একই ফোন কিনতে একজন গড় আয়ের মানুষের প্রায় ১৬০ কর্মদিবস বা আট মাসের বেতন প্রয়োজন হয়-যা বৈশ্বিক আয়বৈষম্যের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
'৩২০০ ডলারের ডুয়ো' কোন দেশে সবচেয়ে বেশি কষ্টসাধ্য
আইফোন 'ডুয়ো'র দাম আইফোন ১৭ প্রো-র প্রায় তিন গুণ। গড় মাসিক আয়ের তথ্যের ভিত্তিতে ৫২বাংলা তৈরি করেছে একটি সহজবোধ্য 'দুঃসাধ্যতা সূচক' (Difficulty Index), যেখানে ১ মানে সবচেয়ে সহজলভ্য আর ১০ মানে সবচেয়ে বেশি কষ্টসাধ্য। হিসাবের পদ্ধতি সহজ: ডুয়োর দাম (৩২০০ ডলার) ÷ (গড় মাসিক আয় ÷ ২২ কর্মদিবস) = প্রয়োজনীয় কর্মদিবস।
দেশ গড় মাসিক আয় (আনুমানিক) সময় লাগবে (আনুমানিক) দুঃসাধ্যতা সূচক (১-১০)
সুইজারল্যান্ড ~৭,৭০০ ডলার ৯ কর্মদিবস ১
লাক্সেমবার্গ ~৭,৫০০ ডলার ৯ কর্মদিবস ১
যুক্তরাষ্ট্র ~৫,২০০ ডলার ১৪ কর্মদিবস ১
যুক্তরাজ্য ~৪,৩০০ ডলার ১৬ কর্মদিবস ১
ফিলিপাইন ~৭৭০ ডলার ৯১ কর্মদিবস (৪ মাস) ৩
তুরস্ক / ব্রাজিল ~৪৫০-৫০০ ডলার ১৪১-১৫৭ দিন (~৬-৭ মাস) ৪
ভিয়েতনাম ~৪৩০ ডলার ১৬৪ কর্মদিবস (~৭.৫ মাস) ৫
ভারত ~৩০০ ডলার ২৩৫ কর্মদিবস (~১০.৫ মাস) ৬
বাংলাদেশ ~২৩০ ডলার ৩০৬ কর্মদিবস (~১৪ মাস) ৮
পাকিস্তান ~১৮০ ডলার ৩৯১ কর্মদিবস (~১৮ মাস) ১০
অর্থাৎ, একই আইফোন 'ডুয়ো' যেখানে সুইজারল্যান্ডের একজন কর্মীর জন্য মাত্র দুই সপ্তাহের বেতনের সমান, সেখানে পাকিস্তান বা বাংলাদেশের একজন গড় আয়ের মানুষের জন্য তা প্রায় দেড় বছরের সঞ্চয়ের সমান-যা কার্যত অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে।
৫২বাংলা ডেস্ক নোট : এই আয়ের পরিসংখ্যান বিভিন্ন সাম্প্রতিক জরিপ ও প্রতিবেদন থেকে নেওয়া আনুমানিক গড় মাসিক আয় (কোনো কোনো দেশে নিট, কোনোটায় মোট আয়)-দেশভেদে পদ্ধতিগত পার্থক্য থাকতে পারে। এছাড়া অনেক দেশে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায়, আমদানি শুল্ক ও করের কারণে আইফোনের প্রকৃত স্থানীয় দাম আন্তর্জাতিক তালিকামূল্যের (৩২০০ ডলার) চেয়ে অনেক বেশি হয়-অর্থাৎ বাস্তবে সময় আরও বেশি লাগতে পারে।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এফডিএম-এর প্রধান বিশ্লেষক বেন উড মনে করেন, টার্নাসের পদোন্নতির সময় বেছে নেওয়া হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় আইফোন উন্মোচনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই। তার ভাষায়, অ্যাপলে কোনো কিছুই দুর্ঘটনাক্রমে ঘটে না।
ফরেস্টারের বিশ্লেষক দিপাঞ্জন চ্যাটার্জি সতর্ক করে বলেন, ফোল্ডেবল ফোনটি অ্যাপলের পণ্যতালিকায় একটি চড়া দামের 'শোপিস' হয়ে থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা মর্যাদা বাড়ালেও প্রকৃত প্রবৃদ্ধি আনতে নাও পারে। তার মতে, এর পরিণতি হতে পারে অ্যাপলের ভিশন প্রো হেডসেটের মতো, যা দামি হলেও ক্রেতাদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি।
উড জানান, বর্তমানে স্যামসাং ও হুয়াওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের ফোল্ডেবল স্মার্টফোন মোট স্মার্টফোন বিক্রির মাত্র ২ শতাংশ দখল করে আছে, আর আগামী এক দশকে এই বাজার মোট বিক্রির মাত্র ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে এফডিএম-এর তথ্য-উপাত্তে উঠে এসেছে।
সূত্র: বিবিসি নিউজ, টেনস্কোপ আইফোন অ্যাফোর্ডেবিলিটি ইনডেক্স, প্রথম আলো