যুক্তরাজ্যে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দকৃত বেনিফিট কমানোর ক্ষেত্রে জনসমর্থন এখনও "উল্লেখযোগ্যভাবে দৃঢ়" রয়েছে এবং এই বেনিফিট কমানো রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে জানিয়েছে একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদন।
ব্রিটিশ সোশ্যাল অ্যাটিটিউডস জরিপের এই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র ১০ জনের মধ্যে ১ জনেরও কম মানুষ ডিসএবিলিটি বেনিফিট কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন, আর প্রায় অর্ধেক মানুষ বলেছেন, কর বাড়লেও তারা এই খাতে আরও বেশি ব্যয়ের পক্ষে।
বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ডিসএবিলিটি বেনিফিটের ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার মধ্যেই এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো। মূল ডিসএবিলিটি বেনিফিট খাতে ব্যয় আগামী এক দশকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪১ বিলিয়ন পাউন্ডে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ব্যয় কমানো সহজ হবে না। প্রতিবেদনের সহ-লেখক ও কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. রবার্ট দ্য ভ্রিস বলেন, রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়লেও ডিসএবিলিটি বেনিফিটের প্রতি জনসমর্থন এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে দৃঢ়। তাঁর ভাষায়, খুব কম মানুষই বেনিফিট কমানোর পক্ষে, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের সহায়তা পাওয়ার সবচেয়ে যোগ্য গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এবং রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের প্রায় সব অংশের কাছেই এই বেনিফিট কমানোর প্রস্তাব ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হয়।
এই বিশ্লেষণটি ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে সংগৃহীত ৪ হাজার ৬৫৬টি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি। গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, স্যার কিয়ার স্টারমারের সরকার পিআইপি (পার্সোনাল ইন্ডিপেনডেন্স পেমেন্ট) সংস্কারে ব্যর্থ হওয়ার ঠিক পরপরই সাক্ষাৎকারগুলো নেওয়া হয়েছিল, ফলে ওই সময় মানুষ ডিসএবিলিটি বেনিফিটের প্রতি বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল থাকতে পারেন। তাঁরা সতর্ক করে বলেন, এই বেনিফিট নিয়ে জনমত মূলত নির্ভর করে মানুষের মনে কোন ধরনের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তির চিত্র ভেসে ওঠে তার ওপর, কারণ আগের গবেষণায় দেখা গেছে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে জনগণ বেশি "যোগ্য" হিসেবে দেখে।
এই ফলাফল এমন এক সময়ে এসেছে যখন দরিদ্রদের জন্য কল্যাণ ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে সমর্থন প্রায় সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। লেবার পার্টি, কনজারভেটিভ পার্টি ও রিফর্ম ইউকে- সবাই স্বাস্থ্য ও ডিসএবিলিটি বেনিফিট খাতে ব্যয় কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে, অন্যদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাট, গ্রিন পার্টি ও এসএনপি এই ব্যয় হ্রাসের বিরোধিতা করছে। গত বছর স্যার কিয়ারের ব্যয় হ্রাসের উদ্যোগ তাঁর নিজ দলের অনেকের বিরোধিতার মুখে পড়ে, যার ফলে সরকারকে পিছু হটতে হয়।
কর্মক্ষম বয়সীদের জন্য সামগ্রিক কল্যাণ ব্যয় জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশের নিচে স্থিতিশীল থেকেছে গত ৪০ বছর ধরে, যদিও ১৯৯০-এর দশকে, ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর এবং কোভিড মহামারির সময় তা মাঝেমধ্যে ৫ শতাংশের বেশি হয়েছে। তা সত্ত্বেও, দরিদ্রদের জন্য কল্যাণ ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে সমর্থন গবেষকদের রেকর্ড করা সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি বলে জরিপে উঠে এসেছে। "সরকার কি দরিদ্রদের কল্যাণে বেশি ব্যয় করবে, এমনকি কর বাড়লেও" - এই প্রশ্নে ২৭ শতাংশ উত্তরদাতা হ্যাঁ বলেছেন, আর ৪২ শতাংশ এর বিপক্ষে মত দিয়েছেন।
সামগ্রিক কল্যাণ ব্যয় স্থিতিশীল থাকলেও, মোট ব্যয়ের মধ্যে ডিসএবিলিটি বেনিফিটের অংশ ক্রমশ বাড়ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বর্তমানে ৪০ লাখ মানুষ পার্সোনাল ইন্ডিপেনডেন্স পেমেন্ট (পিআইপি) পাচ্ছেন, যা মূল ডিসএবিলিটি বেনিফিট হিসেবে বিবেচিত। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৬.৩ বিলিয়ন পাউন্ড থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৭.৩ বিলিয়ন পাউন্ডে, এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৪১ বিলিয়ন পাউন্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৯ শতাংশ, কর বাড়লেও ডিসএবিলিটি বেনিফিটে সার্বিকভাবে বেশি ব্যয়ের পক্ষে মত দিয়েছেন। যারা কাজ করতে অক্ষম বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তি, তাদের বেনিফিট কমানোর পক্ষে মাত্র ৭ শতাংশ মত দিয়েছেন। রান্না, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও গোসলের মতো দৈনন্দিন কাজে সহায়তার জন্য বাড়তি অর্থ প্রদানের পক্ষেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন- রান্নায় সহায়তার জন্য ৮৩ শতাংশ, বাজেট ব্যবস্থাপনায় ৮০ শতাংশ ও গোসলে সহায়তার জন্য ৭৮ শতাংশ মানুষ সমর্থন জানিয়েছেন। মাত্র ৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, এই তিনটি কাজের কোনোটির জন্যই বাড়তি অর্থ দেওয়া উচিত নয়।
উত্তরদাতাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়নি যে এসব বেনিফিট পাওয়া আরও কঠিন করা উচিত কিনা।
চলতি বছরের গ্রীষ্মে প্রকাশিত একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে পিআইপি ব্যবস্থাকে উপযুক্ত নয় বলে উল্লেখ করার পর, সরকার শরৎকালে এই বেনিফিট সংস্কারের প্রস্তাব উপস্থাপন করবে বলে জানা গেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া লেবার পার্টির ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৫৭ শতাংশ ডিসএবিলিটি বেনিফিটে বেশি ব্যয়ের পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে ব্যয় কমানো ভুল হবে— এই বিষয়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য দেখা গেছে। মাত্র ৫ শতাংশ লেবার ভোটার, ৭ শতাংশ কনজারভেটিভ ভোটার ও ১১ শতাংশ রিফর্ম ইউকে সমর্থক এই বেনিফিট কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
ন্যাশনাল সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চ পরিচালিত ব্রিটিশ সোশ্যাল অ্যাটিটিউডস জরিপ ১৯৮৩ সাল থেকে জনমত যাচাই করে আসছে।
সূত্র: বিবিসি নিউজ
-
চাপের মুখেও অনড় মিলিব্যান্ড, ইসরাইলি বসতির পণ্যে নিষেধাজ্ঞার পথে যুক্তরাজ্য
-
ইংলিশ চ্যানেলে একটি ডিঙি নৌকা থেকে উদ্ধার প্রায় ১৪০ অভিবাসী
-
‘সোশ্যাল মিডিয়ায় যা মনে আসে তা-ই লিখবেন না’: তরুণদের সতর্ক হওয়ার পরামর্শ ব্রিটিশ এমপির
-
সিলেট-ইস্তাম্বুল সরাসরি ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ, ইউরোপযাত্রায় খুলছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার
-
লন্ডনের স্কুলে মোবাইল নিষিদ্ধ: বদলে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের আচরণ