ঢাকা ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
ঢাকা ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
সর্বশেষ
যুক্তরাজ্যে ঈদের ছুটির দাবিতে হোয়াইটচ্যাপেলে দিনব্যাপী ক্যাম্পেইন, ১১ মে আলতাব আলী পার্কে সমাবেশ কলকাতায় মাংসের দোকানে বুলডোজার চালালো বিজেপি সমর্থকরা ১১ বছরের শিশু অন্তঃসত্ত্বা : নেত্রকোণার সেই মাদ্রাসাশিক্ষক গ্রেপ্তার ইরানকে ‘পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার’ হুমকি ট্রাম্পের মোদী সুনামিতে ভেঙে পড়ল মমতার শক্ত রাজনৈতিক দুর্গ, নেপথ্যে পাঁচ কারণ ঢাকা বার নির্বাচনে ২০ হাজারের মধ্যে পড়ল ৭ হাজার ভোট, জামায়াত-এনসিপি’র ভরাডুবি পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল হঠিয়ে আসছে বিজেপি? প্রাথমিক গণনায় এগিয়ে ঢাকা-সিলেট ‘সড়ক ও রেল’ যোগাযোগ উন্নত করা হচ্ছে : জানালেন প্রধানমন্ত্রী লিমনের পর বৃষ্টির মরদেহ যেভাবে শনাক্ত করল ফ্লোরিডা পুলিশ ইরানের নতুন ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাব, গ্রহণে ‘সন্দিহান’ ট্রাম্প ‘যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে’ ইরান যুদ্ধ শেষ—জানালেন ট্রাম্প, ইরানের জন্য স্থলপথ খুলে দিল পাকিস্তান ইতালিতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, পরিবারকে ভিডিও কলে দেখালেন মরদেহ হামে প্রতিদিন মরছে মানুষ : ইউনিসেফের সতর্কতা উপেক্ষা করে টিকা কেনার পদ্ধতি পাল্টায় ইউনূস সরকার: সায়েন্সের প্রতিবেদন সিলেটের বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ৭৫০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প ,শনিবার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী বিএনপি সরকার কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে পারবে? নিউ ইয়র্কে মসজিদে মেয়ে শিশুকে নির্যাতনের অভিযোগে বাংলাদেশি ইমাম গ্রেপ্তার ইরানে আবার হামলা শুরু হতে পারে, ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা সরানোর আভাস ট্রাম্পের যুক্তরাজ্য বিএনপির ৪১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন সংসদে জামায়াত-রাজাকার ইস্যুতে মুখ খুললেন বিএনপির মন্ত্রীরা ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো ইমির জামিন, আইভীও জামিন পেলেন দুই হত্যা মামলায় ১১ টন ইউরেনিয়াম মজুত করল কীভাবে ইরান, কোথায় সেই মজুত? টাওয়ার হ্যামলেটসে লুৎফুর রহমান ও এসপায়ার পার্টির ইশতেহার ঘোষণা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-‘আমরা নারী’ সমঝোতা : শিক্ষা-গবেষণায় কাজ করবে কাঁদছেন কৃষকরা, ১৬০০ খরচ করে ৬০০ টাকায় ধান বিক্রি রোমানিয়ায় অনিয়মিত বাংলাদেশিদের সুখবর ইতালিতে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ গেল বাংলাদেশি কর্মীর বিএনপি–জামায়াত পাল্টাপাল্টি বক্তব্য: কেবলই রাজনীতি? ফজলুরের বক্তব্যে সংসদ উত্তপ্ত: ‘শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করতেই পারে না’ প্রবাসীদের দোরগোড়ায় সেবা, নাপোলিতে সফল কনসুলার ক্যাম্প নতুন মুসলিমদের পাশে ইস্ট লন্ডন মসজিদ, চালু হলো নিউ মুসলিম হাব

টং দোকান থেকে অট্টালিকা—ভূমিকম্প আতঙ্কে ঢাকাবাসী

প্রকাশিত: ২৩ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০১ পিএম

টং দোকান থেকে অট্টালিকা—ভূমিকম্প আতঙ্কে ঢাকাবাসী

‘আমি চা বানাচ্ছিলাম, হঠাৎ দোকানের ক্যাশবাক্সসহ পুরো দোকান কেঁপে উঠলো। ভয় পেয়ে আমরা কয়েকজন বাইরে বের হয়ে দেখি, কাছের একটি ভবনের রেলিং ভেঙে কয়েকজন গুরুতর আহত। কাছে গিয়ে দেখি তিনজন ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন, আরও বেশ কয়েকজন আহত। চারদিকে মানুষ শুধু চিৎকার করছে। কয়েক মুহূর্তের এই দুঃসহ দৃশ্য তখন দুঃস্বপ্ন মনে হলেও মাথা থেকে আর সরাতে পারছি না। এখনও আতঙ্ক কাটেনি—কখন আবার ভূমিকম্প হয়, সেই ভয়ে আছি।’

গত শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে পুরোনো ঢাকার বংশালের আরমানিটোলায় একটি ভবনের ছাদের রেলিং ভেঙে তিনজনের মৃত্যু হয়। সেই ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বাংলা ট্রিবিউনকে এভাবেই জানালেন চা দোকানদার আবুল কাশেম।

তিনি আরও বলেন, ‘জীবিকার তাগিদে ঢাকায় ১৬ বছর ধরে ব্যবসা করি। ৮ বছরের একটি মেয়ে আর ১২ বছরের একটি ছেলে আছে—দু’জনেই স্কুলে পড়ে। চোখের সামনে এমন দুর্ঘটনা দেখার পর আর চা বানাতে মন বসে না। ছেলে-মেয়েদের নিয়েই বেশি চিন্তা। দোকানে যারা আসে, সবাই নানারকম কথা বলছে—রাজধানীর বেশিরভাগ ভবন নাকি ঝুঁকিপূর্ণ। আমি মরে গেলেও সমস্যা নেই, কিন্তু বাচ্চাদের যদি কিছু হয় তাহলে তো আমরাও শেষ।’

চা দোকানদার কাশেমের মতোই এখন টং দোকান থেকে উঁচু অট্টালিকা—সব জায়গাতেই ভূমিকম্পের আতঙ্ক। আগুন, সড়ক দুর্ঘটনা, নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ—এগুলো রাজধানীর নিয়মিত চিত্র হলেও মাত্র ৩২ ঘণ্টায় চারবার ভূমিকম্প ঘটায় নতুন আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও নগরবিদরা বলছেন—এটি ছিল শুধু সতর্কতার পূর্ব সংকেত; এখনই যথাযথ প্রস্তুতি না নিলে ঢাকা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

ভূমিকম্পে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভবনে ফাটল—আতঙ্কে বাসিন্দারা

গত শুক্রবার (২১ নভেম্বর) রাজধানীসহ দেশের নানা এলাকায় অনুভূত ভূমিকম্পে ঢাকার বেশ কিছু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মালিবাগ চৌধুরী পাড়া, আরমানিটোলা, স্বামীবাগ, বনানী, কলাবাগান, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ন্দা, দক্ষিণ বনশ্রী, মোহাম্মদপুর, খিলগাঁও, বাড্ডা, সিপাহীবাগ, মধুবাগ এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকার অন্তত একটি করে ভবনে ফাটলের খবর পাওয়া গেছে।

এছাড়া রামপুরা টিভি রোডের কয়েকটি ভবন, কলাবাগানের আবেদখালী রোডের একটি ভবন হেলে পড়েছে। উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর রোডের ছয়তলা একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় চারদিকে বড় ফাটল ধরেছে। পঙ্গু হাসপাতালের সামনের অংশেও ওপর পর্যন্ত বড় ফাটল দেখা গেছে। পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি ভবনসহ কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও ঢাকা কলেজের আবাসিক হলের বিভিন্ন অংশেও ফাটল সৃষ্টি হয়েছে।

বাড্ডার যেই ভবনে ফাটল ধরেছে, সেখানকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘দুই দিন আগেও নিশ্চিন্তে বউ–বাচ্চা নিয়ে ঘুমাতে পারতাম। কিন্তু গতকালের ভূমিকম্প সব বদলে দিয়েছে। আল্লাহর রহমতে বড় দুর্ঘটনা হয়নি। তবে ভবনে ফাটল ধরার পর সবাই আতঙ্কে আছে—কখন কী হয়ে যায়। বাসা ছাড়ার কথাও জানিয়েছি।’

পুরান ঢাকার বাসিন্দা তাজুল খন্দকার বলেন, ‘বাসা থেকে একটু দূরেই গতকাল দুর্ঘটনায় তিনজন মারা গেছে। আমার ভবনেও ফাটল দেখা দিয়েছে, টাইলস খসে পড়ছে। কী করবো বুঝতে পারছি না। পুরো শহরের একই অবস্থা। ভাবছি পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে যাব, কিন্তু ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা আর চাকরির কথা ভেবে থাকতে বাধ্য হচ্ছি।’

ধানমন্ডির বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন মিন্টু বলেন, ‘দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের কঠোর প্রয়োগ করে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলতে হবে। যেসব ভবন সংস্কার করলে ঝুঁকি কমবে, সেগুলোর তালিকা করে দ্রুত সংস্কারের ব্যবস্থা নিতে হবে রাজউক ও সিটি করপোরেশনের।’

কবি নজরুল কলেজের শহীদ শামসুল আলম হলের শিক্ষার্থী বিপ্লব শেখ বলেন, ‘হলের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল ধরেছে। এখানে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী থাকে। সবাই আতঙ্কে আছে। কলেজ প্রশাসনকে জানানো হয়েছে, কিন্তু তারা কিছু বলেনি। ঐতিহ্যের কথা বলে বহুদিন ধরে কোনও সংস্কার হয়নি—এখন সবাইকে ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হচ্ছে।’

দুশ্চিন্তার মূল কারণ—নকশাবহির্ভূত ভবন

রাজধানীর প্রায় ৭৪ শতাংশ ভবন নকশাবহির্ভূত—অর্থাৎ অনুমোদন ছাড়া তৈরি, বা অনুমোদিত নকশা থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতিতে নির্মিত। শুধু আবাসিক নয়, বাণিজ্যিক ভবন, মার্কেট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সর্বত্রই এই অনিয়ম। যে সব ভবনে এবার ফাটল ধরেছে, বেশিরভাগই নকশাবহির্ভূত। ফলে বড় ভূমিকম্প হলে বিপদ আরও বাড়বে।

সেফটি অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের এক সেমিনারে জানানো হয়—ঢাকায় ২১ লাখ ৪৬ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এসব ভবনের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কারণ—গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা মানা হয়নি, নিরাপত্তা যাচাই নেই, দুর্যোগ–সহনশীল নকশা নেই। বড় ভূমিকম্প হলে এই ভবনগুলো ‘মৃত্যুপুঞ্জে’ পরিণত হতে পারে।

স্থপতি ও নগরবিদ মো. ইকবাল হাবিব বলেন, ‘ঢাকার প্রায় ১৩ শতাংশ এলাকায় কোনও ধরনের নির্মাণ নিষিদ্ধ। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণে সেসব জায়গায়ও ভবন তৈরি হচ্ছে। পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙা তো দূরের কথা, তার ওপর নতুন ভবন উঠছে। বহুদিন ধরে এসব বিষয়ে পরামর্শ দিলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। ফলে এখন শহরটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘শুক্রবার যে তীব্র ঝাঁকুনি অনুভূত হয়েছে—সাম্প্রতিক সময়ে দেশের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। রাজধানী যে কত বড় ঝুঁকিতে রয়েছে, তা অনেকেই কল্পনাও করতে পারছেন না। এখনই উচ্চ পর্যায় সতর্ক না হলে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।’