ইউনিসেফের সতর্কতা উপেক্ষা করে টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার—এমনটাই উঠে এসেছে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী American Association for the Advancement of Science-এর ওয়েবসাইট Science-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালুর ফলে টিকা সরবরাহে বিলম্ব ঘটে, যার কারণে বাংলাদেশে টিকাদান কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এর প্রভাব হিসেবে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে শুরু করে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অল্প সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং ২৫০ জনের বেশি মারা গেছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু।
দেশের হাসপাতালগুলোতে পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। চলতি মাসের শুরুতে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বিপুলসংখ্যক শিশুকে ভর্তি করা হয়, যাদের অনেকেই শ্বাসকষ্টে ভুগছিল।
শয্যা সংকটের কারণে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একসময় প্রায় নির্মূল বলে বিবেচিত হাম রোগ আবারও ফিরে আসছে। কানাডা ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ এখন আর ‘হামমুক্ত’ নয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এ বছর ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে, যেখানে দুই দশক আগে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১০০। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সায়েন্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিকা নিতে অনীহা, কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন এবং বিভিন্ন সংঘাত পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে হাম পুনরায় ছড়িয়ে পড়ছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে টিকা ক্রয়ে স্থবিরতা দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিকেই হাম প্রাদুর্ভাবের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
সে সময় দেশে টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয় এবং টিকাদানের হার কমে যায়। অপুষ্টি ও দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণে শিশু মৃত্যুও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে সাধারণত ৯ ও ১৫ মাস বয়সে শিশুদের হাম-রুবেলা টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। প্রতি চার বছর পরপর সারা দেশে কর্মসূচি চালিয়ে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
আগে এই টিকা সরবরাহ করত UNICEF, যার অর্থায়ন আসত মূলত বৈশ্বিক টিকা জোট Gavi, the Vaccine Alliance এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে।
তবে টিকা সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি ‘বিতর্কিত’ পরিবর্তন আনে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অধ্যাপক Muhammad Yunus-এর নেতৃত্বাধীন সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করে।
এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ইউনিসেফ সতর্ক করেছিল যে, এতে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হতে পারে এবং মহামারির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি Rana Flowers বলেন, “বিষয়টি খুবই হতাশাজনক ছিল।”
তিনি আরও জানান, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে তিনি অনুরোধ করেছিলেন, “যেন এটি না করা হয়।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, দরপত্র প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যাওয়ায় টিকার মজুত শেষ হয়ে যায় এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে।
হাম-রুবেলা টিকাদানের সম্পূরক কর্মসূচি ২০২৪ থেকে পিছিয়ে ২০২৫ সালে নেওয়া হয় এবং একটি কর্মসূচি বাতিল করা হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা শিবিরে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে দ্রুত ৫৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে অন্তত ২১ হাজারের বেশি মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে।
গত ২৩ এপ্রিল World Health Organization সতর্ক করে জানায়, মিয়ানমারের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে এবং ভারতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, এই প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে হাম নির্মূলে আগের সাফল্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।
সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর বলেন, টিকার ঘাটতির পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ বিতরণ কর্মসূচি তিন দফা বন্ধ থাকায় শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসাইন বলেন, “টিকাদানের ঘাটতির বাইরে বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা বে-নজির আহমেদ বলেন, “বর্তমানে হাম যে গতিতে ছড়াচ্ছে, তাতে জরুরি কর্মসূচি দিয়েও এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।”
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, সরকার আবারও ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ শুরু করেছে এবং ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকাদান কার্যক্রম চালু হয়েছে।
হামের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকার—উভয়কেই দায়ী করা হয়েছে।
তবে Sheikh Hasina ই-মেইলে জানিয়েছেন, তার শাসনামলে টিকাদান অগ্রাধিকার পেয়েছিল এবং বড় ধরনের হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি।
এদিকে টিকা ক্রয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান দাবি করেন, আগের ক্রয় পদ্ধতি জরুরি প্রয়োজনের ভিত্তিতে তৈরি ছিল এবং সেটির সংস্কার প্রয়োজন ছিল।
তিনি ই-মেইলে জানান, নতুন পদ্ধতির লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ না ওঠে।
যদিও আগের পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিলেও শিশুদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, “হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক।”
-
বিএনপি সরকার কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে পারবে?
-
সংসদে জামায়াত-রাজাকার ইস্যুতে মুখ খুললেন বিএনপির মন্ত্রীরা
-
৭ মার্চের ভাষণ বাজানো ইমির জামিন, আইভীও জামিন পেলেন দুই হত্যা মামলায়
-
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-‘আমরা নারী’ সমঝোতা : শিক্ষা-গবেষণায় কাজ করবে
-
কাঁদছেন কৃষকরা, ১৬০০ খরচ করে ৬০০ টাকায় ধান বিক্রি
আরও পড়ুন: