সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন হঠাৎ করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মূলত ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর শীর্ষ নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের জেরে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
শুরুতে দুই দলের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এর প্রভাব পড়েছে। সংসদেও চলছে কথার লড়াই। বিশ্লেষকদের মতে, এতে দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়তে পারে।
জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিবের কঠোর বক্তব্য এবং বিরোধী দলের আন্দোলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—বিএনপি কি জামায়াতকে কোনো ধরনের ছাড় দিতে চায় না?
এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘সরকার ও বিরোধী দলের নেতারা সব সময় বিপরীতমুখী রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে হরতালের বিষয়ে সরকারে থাকলে এক, আর বিরোধী দলে থাকলে অবস্থান হয় আরেক রকম। এ মুহূর্তে সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনকে কিছুটা হলেও উত্তপ্ত পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দূরত্ব দিনক্ষণ বেঁধে তৈরি হয় না। যেকোনও ইস্যুতেই এর সূচনা হতে পারে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘সরকার বিরোধী দলকে চাপে রাখতে চাইবে এটাই তো রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বিএনপিও হয়তো সে পথেই হাঁটতে পারে।’’
সরকার গঠনের পরপরই দুই দলের নেতাদের বক্তব্যে এক ধরনের সমঝোতার ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিবেশ বদলাতে থাকে। এখন শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত অস্থিরতা স্পষ্ট।
সম্প্রতি রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে ক্ষমতায় এসেছে।
তার এই বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত ২৫ এপ্রিল নয়াপল্টনে দলের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘‘জামায়াত কখনোই সুষ্ঠুভাবে চিন্তা করে না, তা প্রমাণিত হয়েছে। তাদের যে অতীত ইতিহাস, আমরা সবাই ভালো করে জানি। সমগ্র জাতি সচেতনভাবে তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। আগামীতে যেন রাজনৈতিকভাবে তাদের পুরোপুরি নির্মূল করা যায়, সেভাবে আমাদের কাজ করতে হবে।’’
এর একদিন পর বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি একে ‘অগণতান্ত্রিক ও অনভিপ্রেত’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘‘জামায়াতকে ‘রাজনৈতিকভাবে নির্মূল’ করার হুমকি দিয়ে বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্য অসাংবিধানিক, অনাকাঙ্ক্ষিত ও অশোভন। একজন দায়িত্বশীল নেতার কাছ থেকে এমন রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত মন্তব্য প্রত্যাশিত নয়।’’
এরপর গত ২৭ এপ্রিল যশোরে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘‘জনগণের শান্তি নষ্ট করে ১৭৩ দিন হরতাল পালন করবে—এমন সুযোগ আর কাউকে দেওয়া হবে না।’’
জাতীয় সংসদেও একই চিত্র দেখা গেছে। বক্তব্যের সময় একপক্ষ অন্যপক্ষকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে, অতীত ইতিহাস টেনে আনা হচ্ছে।
গত ২৮ এপ্রিল সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান–এর বক্তব্যের সময় প্রায় ১০ মিনিট অধিবেশন অচল হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘‘কোনও মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। কোনও শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াত করতেই পারে না, করলে এটা ডাবল অপরাধ।’’
এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদ জানালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে বলেন, ‘‘সারা জাতি দেখছে। লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। সংসদ যদি বিধি মোতাবেক না চলে, তাহলে এই সংসদ আর থাকবে না।’’
তৃণমূল পর্যায়েও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
গত ২৫ এপ্রিল নেত্রকোনায় জামায়াত নেতা মাছুম মোস্তফার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। তার গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মীদের দায়ী করা হলেও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ২৭ এপ্রিল বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে যুবদল কর্মী শাকিল মাহমুদ গুলিবিদ্ধ হন। উভয়পক্ষের অন্তত আটজন আহত হন।
এর আগের দিন কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুই নেতার ওপর হামলার জেরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে জামায়াত কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে এবং অন্তত ছয়জন আহত হন। দেশের আরও কয়েকটি জেলাতেও একই ধরনের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন দুই দলের নেতারা। সরকার পক্ষের মতে, বিরোধী দল উসকানি দিচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের অভিযোগ—সরকার ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘‘নির্মূলের রাজনীতি অতীতেও বুমেরাং হয়েছে। ভবিষ্যতে যারা আবার এ ধরনের চেষ্টা করবে, তাদের একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে জামায়াতকে নিয়ে যে ধরনের বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তা অপ্রত্যাশিত। একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’’
অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘‘আমরা শুরুতেই সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে আসছি। আমাদের ধৈর্যের কোনও কমতি নেই। তারপরও বিরোধী দল পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চাইছে, যা কাম্য নয়।’’
তিনি সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান।