কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে কয়েক দিন আগেও পাকা ধানের দোলায় উৎসবের আমেজ ছিল। কৃষকরা কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু রোববার থেকে টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলার বড় অংশের বোরো ধান তলিয়ে গেছে। চোখের সামনে পরিশ্রম আর ঋণের টাকায় ফলানো ফসল ডুবে যেতে দেখে হতাশ কৃষকরা। প্রকৃতির এই আচমকা রূপ তাদের সমস্ত হিসাব এলোমেলো করে দিয়েছে। নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দের বদলে এখন চারদিকে অনিশ্চয়তা আর হতাশা। উপরন্তু, বজ্রপাতের ঝুঁকির কারণে অনেকেই মাঠে নামতে পারছেন না, যা তাদের উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, পাঁচটি উপজেলায় মোট ৮৪৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। এর মধ্যে অষ্টগ্রামে ৪৭০ হেক্টর, ইটনায় ২৫৩ হেক্টর, মিঠামইনে ১০০ হেক্টর, বাজিতপুরে ১২ হেক্টর এবং সদর উপজেলায় ১০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কৃষকদের দাবি, বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। অষ্টগ্রামের খয়েরপুর-আবদুল্লাহপুর ও আদমপুর ইউনিয়নের হাওরে অন্তত দুই হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
মিঠামইনের বৈরাটি ও ঢাকী ইউনিয়নের তিনটি হাওর এবং ইটনার ধনপুর, চৌগাঙ্গা ও সদর ইউনিয়নের একাধিক হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত পানি না নামলে এসব জমির ধান কাটার সুযোগ থাকবে না এবং পচন শুরু হতে পারে। মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল ইসলাম খান অপু বলেন, ‘অতি বর্ষণের কারণে হাওরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চলের জমিগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। মিঠামইনের শতাধিক হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। দ্রুত পানি সরে না গেলে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
এদিকে সোমবার রাতে অতিবৃষ্টিতে আগে কাটা ও মাড়াই করা ধানও রক্ষা পায়নি। মাঠে শুকাতে দেওয়া কয়েকশ হেক্টর জমির ধান আবার পানির নিচে চলে গেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, নদী ভরাট ও ফসল রক্ষা বাঁধের ত্রুটির কারণে প্রতিবছরই এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। খোয়াই নদীর পানি কালনী নদী দিয়ে নামতে না পারায় অষ্টগ্রামসহ আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ ধরার কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জ জেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৩০ টন। আগামী ৩ মে থেকে ধান সংগ্রহ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ইটনায় ৩ হাজার ৪৭ টন এবং অষ্টগ্রামে ২ হাজার ৫৭০ টন সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগের দিন ২৪ ঘণ্টায় ২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। বুধবারও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পানি বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও ইটনায় ২৭ সেন্টিমিটার এবং চামড়াঘাটে ৭ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে।
ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি বাজারদর নিয়েও হতাশ কৃষকরা। করিমগঞ্জের কৃষক ওসমান গনি বলেন, ‘ধান ভালা অইলে কী অইবো। আমরার ধানের দাম নাই। এক মণ ধান বেচলেও একজন শ্রমিকের মজুরি অয় না। এখন হাজার ট্যাকা দিয়াও শ্রমিক পাই না। ১১০০ ট্যাকায় শ্রমিক আনছি। আর বাজারে ধানের দাম ৭০০-৮০০ টাকা। এক মণ ধান ফলাইতে মাঠেই খরচ হইছে ১১০০ থেকে ১২০০ ট্যাকা। ধানের দাম এমন থাকলে ক্যামনে কী অইবো। আমাদের মরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। হারভেস্টার মেশিনের খরচ আরও বেশি। ইচ্ছামতো ট্যাকা নিচ্ছে তারা। কোনও নিয়মকানুন নেই। এক কানি (৩৬ শতাংশ) জমি কাটতে ১৫-১৬ হাজার টাকা নিচ্ছে তারা। সব লোকসান আমাদের।’
নিকলীর কৃষক আবুল কাশেম বলেন, ‘এবার ফলন ভালো হলেও ধান চাষে খরচ হয়েছে অনেক বেশি। ধান কাটাতেও লাগছে অন্যান্য বারের চেয়ে বেশি টাকা। এক মণ ধান ফলাতে জমিতেই খরচ পড়েছে ১১০০ টাকার মতো। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ধানকাটা, মাড়াই আর পরিবহন খরচও। অথচ বাজারে ধানের দাম অনেক কম। ৭০০-৮০০ টাকায় ধান বেচতে বাধ্য হচ্ছি আমরা। ধান চাষ করে এ মৌসুমে বড় লোকসানে পড়েছি।’
একই এলাকার কৃষক আব্দুল মতিন জানান, এক একর জমিতে চাষ থেকে কাটা পর্যন্ত তার খরচ হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা। সেখানে উৎপাদন হবে ৫০ মণের কম, যা বিক্রি করে ৪০ হাজার টাকার বেশি পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় পরিবার-পরিজন নিয়ে চলবো কীভাবে? এভাবে হলে আমরা বাঁচবো?’
ব্যবসায়ীরাও পরিস্থিতি স্বীকার করছেন। পাইকারি ব্যবসায়ী পারভেজ মিয়া বলেন, ‘এবার ধান কিনছেন না বড় ব্যবসায়ীরা। তাদের কাছে আমরা ১০ টাকা ২০ টাকা লাভে ধান বিক্রি করি। যারা ধানের মূল ক্রেতা তারাই দাম দিচ্ছেন না আমাদের। এখানে আমাদের কিছুই করার নেই। কৃষকরা ধান চাষ করে এবার মারাত্মক লোকসানের মধ্যে পড়ে গেছেন।’
হারভেস্টার মেশিনের ব্যয়ও বেড়েছে বলে অভিযোগ কৃষকদের। করিমগঞ্জের কৃষক মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘আগামী বছর আর ধান চাষ করবো না। জমি পতিত থাকলে থাকুক। ধান চাষ করে ফকির হয়ে যাচ্ছি, আর কুলিয়ে উঠতে পারছি না। আমাদের ধান সস্তায় কিনে মিল আর চাতাল মালিকরা তো ঠিকই বেশি দামে চাল বেচে। এখনও ২৫ কেজি চালের বস্তা কিনতে হচ্ছে দেড় হাজার টাকায়। অথচ আমাদের ধানের মণ ৮০০ টাকা। এটা অন্যায়, আর চাষ করবো না।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, এ বছর ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, যার মধ্যে হাওরাঞ্চলে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৫ হেক্টর। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ২৯ মেট্রিক টন ধান।
উপপরিচালক সাদিকুর রহমান বলেন, ‘এ বছর বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ বাজারে ধানের দাম কম। আমরা ধানের প্রকৃত উৎপাদন খরচ উচ্চমহলে পাঠাবো। আমরা চাই কৃষক যেন কোনোভাবে ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হন। আমরা কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছি। ইতিমধ্যে ৪৮ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ধানগাছ ৫-৬ দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতি বাড়বে, এর আগে পানি নেমে গেলে ক্ষতি কম হবে।’