যুক্তরাজ্যকে ব্যঙ্গ করে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ব্রিটিশ গণমাধ্যমে ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের সংবাদ পরিবেশন নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন, যা ব্রিটিশ ইহুদি নেতাদের কাছ থেকে ‘ইসলামবিদ্বেষী ও বিভেদমূলক’ আখ্যা পেয়েছে।
কী বলেছিলেন নেতানিয়াহু
বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট প্রচারিত ইসরায়েলি আর্মি রেডিওর একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে নেতানিয়াহু ব্রিটেনে ইসরায়েলপন্থী সংবাদ পরিবেশনের পরিবর্তন নিয়ে কথা বলছিলেন। তিনি ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সাংবাদিক র্যান্ডলফ চার্চিলের ইসরায়েলপন্থী প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বর্তমান ব্রিটিশ গণমাধ্যমে সে ধরনের ইতিবাচক অবস্থান খুঁজে পাওয়া কঠিন। এরপর ব্যঙ্গাত্মকভাবে তিনি আজকের ব্রিটেনকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ নামে অভিহিত করেন।
পডকাস্টের সঞ্চালক ইউরোপের অন্যান্য দেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে কি না জানতে চাইলে নেতানিয়াহু আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ব্রিটেন হতে পারে পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রথম ‘ইসলামিক রিপাবলিক’। এরপর তিনি ইরানের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ইসরায়েল নিশ্চিত করছে যেন এমন আরেকটি দেশ ইরান না হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জেডি ভ্যান্স একই ধরনের একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন, যেখানে তিনি ব্রিটেনকে ভবিষ্যতে প্রথম ‘ইসলামপন্থী’ পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক মন্তব্যটির সঙ্গে সেই তুলনাও করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ ইহুদি নেতাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের প্রগ্রেসিভ জুডাইজম আন্দোলনের নেতারা নেতানিয়াহুর মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন। মুভমেন্ট ফর প্রগ্রেসিভ জুডাইজমের সহ-নেতা রাবাই চার্লি ব্যাগিনস্কি ও রাবাই জশ লেভ এই মন্তব্যকে ‘ঘৃণামূলক’ ও ‘বিভেদমূলক’ বলে অভিহিত করেন।
তাদের ভাষ্যমতে, ব্রিটেনে বর্তমানে ইহুদিবিদ্বেষ, মুসলিমবিদ্বেষ ও সামাজিক বিভাজন মানুষের মধ্যে প্রকৃত ভয় তৈরি করছে—এমন প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর এ ধরনের ভাষা ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’। তারা স্পষ্ট করে আরও বলেন, নেতানিয়াহু ব্রিটিশ ইহুদিদের প্রতিনিধিত্ব করেন না এবং তার এই বক্তব্য ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের অবস্থান নয়।
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের সাবেক ডাউনিং স্ট্রিট চিফ অব স্টাফ গ্যাভিন বারওয়েলও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই মন্তব্যকে সরাসরি ‘স্পষ্ট ইসলামবিদ্বেষ’ (blatant Islamophobia) বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, নেতানিয়াহুকে এখনো ব্রিটেনের বন্ধু মনে করা যাদের বাকি আছে, এই মন্তব্য তাদের সেই ধারণা পুনর্বিবেচনার সুযোগ করে দেবে।
যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল সম্পর্কে টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর মন্তব্যকে বিচ্ছিন্ন কোনো রাজনৈতিক কটাক্ষ হিসেবে দেখলে যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল সম্পর্কের প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না। গাজা যুদ্ধ, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, মানবিক সহায়তা এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিয়ে গত কয়েক বছরে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য ক্রমেই প্রকাশ্য হয়েছে।
যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। ২০২৬ সালের জুনে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রসচিবের বক্তব্যেও এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়, যেখানে গাজার মানবিক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে ইসরায়েলকে মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও জুলাই ২০২৬-এ যুক্তরাজ্য গাজায় মানবিক পরিস্থিতির উন্নতি, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও সহিংসতা বন্ধ এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানায়।
চলতি বছরের মে মাসে ইসরায়েলি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের একটি ভিডিও নিয়েও যুক্তরাজ্য সরকার আপত্তি জানিয়ে লন্ডনে নিযুক্ত ইসরায়েলি চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে পররাষ্ট্র দপ্তরে তলব করেছিল।
মন্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো, ব্রিটেনের ইসরায়েলবিষয়ক নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক অবস্থানকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ শব্দের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ব্রিটেন সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশ, কোনো ইসলামিক রাষ্ট্র নয়-ফলে মন্তব্যটি বাস্তব রাজনৈতিক কাঠামোর বর্ণনা নয়, বরং রাজনৈতিক ব্যঙ্গ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সমালোচকদের মতে, ইসরায়েলবিষয়ক ব্রিটিশ সরকার বা গণমাধ্যমের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু সেই সমালোচনার সঙ্গে ব্রিটেনের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করা ইসলামবিদ্বেষী স্টেরিওটাইপকে উসকে দিতে পারে।
ইসরায়েলের ভেতরেও সমালোচনা
শুধু ব্রিটেনেই নয়, ইসরায়েলের বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও এই মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন। বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আভি দাবুশ বলেন, গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ব্রিটেনকে এই সময়ে উপহাস করা ইসরায়েলের জন্য কূটনৈতিকভাবে ক্ষতিকর, বিশেষত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার প্রেক্ষাপটে।
ব্রিটিশ সরকারের প্রতিক্রিয়া
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর মন্তব্যের বিষয়ে ব্রিটিশ ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (FCDO) তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের পক্ষ থেকেও বক্তব্যটি সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি। তবে যুক্তরাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে গাজা, পশ্চিম তীর ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসরায়েলের সঙ্গে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নেতানিয়াহুর এই মন্তব্যকে তাই বিচ্ছিন্ন কোনো শব্দবিতর্ক হিসেবে নয়, বরং গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্য ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সূত্র: The Guardian; Al Jazeera; Times of Israel
-
খরা ও তাপপ্রবাহে যুক্তরাজ্যজুড়ে নোংরা রাস্তা, পানি সংকট তীব্র হচ্ছে
-
লণ্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটে বসছে স্থায়ী ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা
-
যুক্তরাজ্যে তীব্র খরা, পানি সাশ্রয়ে বিশেষজ্ঞদের জরুরি পরামর্শ
-
যুক্তরাজ্যে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব বাড়ছে, একক নৌকায় রেকর্ড ২৩০ জনের প্রবেশ
-
যুক্তরাজ্যে চশমা পরে গাড়ি চালানোর ডিভিএলএ নিয়ম ভাঙলে জরিমানা ১০০০ পাউন্ড