যুক্তরাজ্যে অভিবাসন ও আশ্রয়নীতিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। ইউগভের এক নতুন জরিপের বরাত দিয়ে দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, ব্রিটেনের জন্য অভিবাসনকে "মূলত ক্ষতিকর" মনে করেন-এমন মানুষের হার গত এক দশকে ৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জরিপটি গত ৮ ও ৯ জুন প্রায় দুই হাজার প্রাপ্তবয়স্ক ব্রিটিশ নাগরিকের ওপর পরিচালিত হয়। একই সময়ে ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ভোট দেওয়া মানুষের মধ্যেও অভিবাসনকে ক্ষতিকর মনে করার হার ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ শতাংশ হয়েছে।
রেকর্ড সংখ্যক অভিবাসীর একক নৌকায় প্রবেশ
অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়টি ব্রিটিশ ভোটারদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যেই ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে একটি বিশাল নৌকায় ২৩০ জনের ব্রিটেনে পৌঁছানোর ঘটনা সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এটি এখন পর্যন্ত একক ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ব্রিটেনে পৌঁছানোর সবচেয়ে বেশি সংখ্যার রেকর্ড, যা এর আগের মাসে সৃষ্ট ১৬৫ জনের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। জানা গেছে, অতিরিক্ত ভারবহনের কারণে নৌকাটি ভেঙে পড়তে শুরু করলে প্রায় ৩০ জন সমুদ্রে পড়ে যান, পরে বর্ডার ফোর্স ও আরএনএলআই (RNLI)-এর লাইফবোট তাদের উদ্ধার করে।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সামগ্রিক চ্যানেল পারাপারের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৩ শতাংশ কমেছে, এবং গত জুলাই মাসে ২০২০ সালের পর সর্বনিম্ন সংখ্যক পারাপার রেকর্ড হয়েছে। সরকার এই পতনের কারণ হিসেবে মানব পাচারকারী চক্রের নৌকা ও ইঞ্জিন সরবরাহ নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযানকে কৃতিত্ব দিচ্ছে-২০২৪ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি নৌকা ও ইঞ্জিন জব্দ করা হয়েছে।
নতুন প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম অবৈধ অভিবাসন ও ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। গত মাসে ডোভার পরিদর্শনকালে তিনি অভিবাসী নৌকা পাচারের বিরুদ্ধে "আপসহীন লড়াই" চালানোর অঙ্গীকার করেন এবং জানান, পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যক্রম পরিচালনাকারী জনবল আরও বাড়ানো হবে। একইসঙ্গে তিনি বৈধ অভিবাসনের পথ খোলা রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
প্রতিবেদনে লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টির অভিবাসননীতির পার্থক্যও তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কনজারভেটিভ সরকারের সময়ে অভিবাসনের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছিল। অন্যদিকে লেবার সরকার অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ ও মানবিক বিবেচনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চাপে রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদের অভিবাসন ও আশ্রয়নীতিও এই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম মন্ত্রিসভা গঠনের সময় তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পদে বহাল রাখেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কঠোর অভিবাসননীতির পাশাপাশি আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নতুন "নিরাপদ ও বৈধ" পথের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। লেবার পার্টির কিছু সংসদ সদস্য অবশ্য আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই নীতির কারণে দলটি প্রগতিশীল ভোটারদের সমর্থন হারাতে পারে।
ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সময়কার অভিবাসন ও আশ্রয়নীতির প্রসঙ্গও আলোচনায় এসেছে। তার আত্মজীবনীতে ব্রিটেনের আশ্রয়ব্যবস্থার পুরোনো ধারণা এবং পরবর্তী সময়ে সেটি বাস্তবায়নের জটিলতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা টেনে বর্তমান অভিবাসন পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক চাপ ও ভবিষ্যৎ প্রবণতা
অভিবাসন ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী বার্নহামের ওপরও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভোটারদের একটি অংশ অভিবাসন ও আশ্রয়ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন চায়। শুধু ধীরগতির বা সীমিত সংস্কার নয়, বরং আগত মানুষের সংখ্যা কমানো এবং অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের আইনি অবস্থান নিয়ে কঠোর নীতি গ্রহণের দাবি রাজনৈতিকভাবে আরও জোরালো হতে পারে।
তবে অভিবাসন ইস্যুতে ব্রিটিশ সমাজে মতভেদও রয়েছে। একদিকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও অভিবাসনের সংখ্যা কমানোর দাবি জোরালো হচ্ছে, অন্যদিকে মানবিক কারণে আশ্রয়প্রার্থীদের সুরক্ষা এবং বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বজায় রাখার পক্ষেও রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাজ্যের অভিবাসননীতি দেশটির রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইংলিশ চ্যানেলে ছোট নৌকায় মানুষের আগমন অব্যাহত থাকলে সীমান্ত নিরাপত্তা, আশ্রয়ব্যবস্থা এবং সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ, ইউগভ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
-
তাপপ্রবাহের মধ্যে লন্ডন-এসেক্সে পাইপ ফেটে ১০ হাজার বাড়িতে পানির সংকট
-
ফারাজের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ তদন্ত পুনরায় চালু, স্বাগত জানালেন ফারাজ নিজেই
-
কিশোর-তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি জিসিএসই ভাষা কোর্স চালু করেছে টাওয়ার হ্যামলেটস
-
যুক্তরাজ্যে ফের বাড়ছে তাপমাত্রা, শিশু-বয়স্কদের বাড়তি সতর্কতার পরামর্শ
-
যুক্তরাজ্যে ১,১০০+ অভিবাসী দোষী, বিতর্কে মানবাধিকার প্রশ্ন