লন্ডনের ফুটপাতে জমে থাকা দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ক্ষোভ দেখা গিয়েছিল, তা এখন আর কেবল রাজধানীর সমস্যা নয়। সাত সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা বৃষ্টিহীনতা ও একের পর এক তাপপ্রবাহের কারণে গোটা যুক্তরাজ্যজুড়েই একই চিত্র ফুটে উঠছে-নোংরা রাস্তা, দুর্গন্ধ, আর তীব্র হয়ে ওঠা পানি সংকট।
- ৭১ শতাংশ ইংল্যান্ড এখন খরাকবলিত
১০ আগস্ট ন্যাশনাল ড্রট গ্রুপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ এলাকা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে খরাকবলিত ঘোষিত, এবং ২ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ পানি ব্যবহারে বিধিনিষেধের আওতায় রয়েছেন।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলস উভয় অঞ্চলেই এবার রেকর্ড পরিমাণ শুষ্কতম জুলাই মাস পার হয়েছে বলে জানিয়েছে মেট অফিস, যেখানে ইংল্যান্ডে স্বাভাবিক দীর্ঘমেয়াদি গড়ের মাত্র ১০ শতাংশ বৃষ্টিপাত হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশজুড়ে সাড়ে চার কোটির বেশি মানুষ এখন কোনো না কোনো খরাকবলিত অঞ্চলে বসবাস করছেন।
এনভায়রনমেন্ট এজেন্সির সবশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী, টানা সাত সপ্তাহ ধরে ইংল্যান্ডে ১০ মিলিমিটারের কম বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে, আর পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডে তা ছিল ১ মিলিমিটারেরও কম।
দেশজুড়ে জলাধারের গড় সঞ্চয় নেমে এসেছে ৬৯ শতাংশে, যা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ কম, আর পাঁচটি জলাধারকে এখন 'অস্বাভাবিক রকম নিম্ন' পর্যায়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃষি খাতেও এর প্রভাব পড়ছে-ফসলের ফলন কমে যাওয়া ও পশুখাদ্যের সংকটের কথাও উঠে এসেছে সরকারি প্রতিবেদনে।
- নয়টি পানি কোম্পানির হোসপাইপ নিষেধাজ্ঞা
বর্তমানে নয়টি পানি কোম্পানি টেম্পোরারি ইউজ ব্যান (হোসপাইপ নিষেধাজ্ঞা) কার্যকর করেছে, যা ২০২২ সালের পর সবচেয়ে ব্যাপক পানি বিধিনিষেধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। টেমস ওয়াটার, সাউথ ইস্ট ওয়াটার, সাউদার্ন ওয়াটার, অ্যাংলিয়ান ওয়াটার, সাউথ ওয়েস্ট ওয়াটার, অ্যাফিনিটি ওয়াটার, কেমব্রিজ ওয়াটার, ওয়েলশ ওয়াটার ও এসেক্স অ্যান্ড সাফোক ওয়াটার -এই তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে সাউদার্ন ওয়াটার আরও এক ধাপ এগিয়ে হ্যাম্পশায়ার ও আইল অব ওয়াইটের জন্য পূর্ণাঙ্গ 'ড্রট অর্ডার' চালুর ব্যাপারে জনমত যাচাই শুরু করেছে, যা কার্যকর হলে সুইমিং পুল, গাড়ি ধোয়া বা জানালা পরিষ্কারের মতো কিছু ব্যবসায়িক ব্যবহারেও বিধিনিষেধ আরোপিত হবে।
জুলাই মাসে লন্ডন ও টেমস ভ্যালি এলাকায় গ্রাহকরা প্রতিদিন অতিরিক্ত ১০ কোটি লিটার পানি ব্যবহার করেছেন, যার ফলে কোনো কোনো সময় পানি সরবরাহের গতি চাহিদার তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে।
- কেন রাস্তা সারা দেশজুড়েই নোংরা দেখাচ্ছে
পরিবেশ সংস্থা কিপ ব্রিটেন টাইডি-র পরিষেবা পরিচালক ড. আনা স্কট মেট্রোকে জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ শুষ্ক আবহাওয়ায় রাস্তার ময়লা স্বাভাবিকভাবে বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যাচ্ছে না, ফলে তা আগের চেয়ে অনেক বেশি চোখে পড়ছে। হোসপাইপ নিষেধাজ্ঞার কারণে স্থানীয় কাউন্সিলগুলোর পক্ষেও ফুটপাত ধোয়ামোছার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে বলে তিনি জানান।
এই প্রবণতার বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে কেমব্রিজে। দীর্ঘ শুষ্ক আবহাওয়া ও খরা পরিস্থিতির মধ্যে পানি ব্যবহার কমাতে কেমব্রিজ সিটি কাউন্সিল সাময়িকভাবে রাস্তা পরিষ্কারের কিছু পদ্ধতি পরিবর্তন করেছে। যদিও নগর কেন্দ্রের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে র্যাপিড রেসপন্স টিম সপ্তাহে সাত দিন সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকছে। অর্থাৎ পুরোনো পদ্ধতিতে ধোয়ামোছা কমিয়ে সীমিত সময়ে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কার্যক্রম কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছে।
শুধু খরা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের আবর্জনা সমস্যাও। কিপ ব্রিটেন টাইডি-র 'রাবিশ রিয়ালিটি' প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরিপ করা শহুরে ও গ্রামীণ এলাকার ৯০ শতাংশের বেশি স্থানেই বর্জ্যের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা যুক্তরাজ্যজুড়ে ক্রমবর্ধমান আবর্জনা সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শুষ্ক আবহাওয়ায় বৃষ্টির স্বাভাবিক 'পরিষ্কারক' ভূমিকা না থাকায় এই পুরোনো সমস্যাটিই এখন অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, এটি শুধু খরার সাময়িক প্রভাব নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবকাঠামো ব্যয় সংকোচনের সঙ্গে বর্তমান পানি সংকট মিলে একটি বড় জাতীয় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে।
- সরকারি পদক্ষেপ ও সতর্কতা
খরার প্রভাব শুধু রাস্তাঘাটে সীমাবদ্ধ নেই-নৌপরিবহনেও এর প্রভাব পড়ছে, নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় খাল-নৌপথে বিধিনিষেধ বাড়ছে এবং ক্যানাল অ্যান্ড রিভার ট্রাস্ট জাতীয় পর্যায়ে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার ৫০০-র বেশি স্থানে পানি উত্তোলনে বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে, এবং পূর্ব অ্যাংলিয়ায় নদীর পানির প্রবাহ রক্ষায় আনুষ্ঠানিক বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা করছে এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি।
লন্ডনসহ যুক্তরাজ্যের একাধিক অঞ্চলে সম্প্রতি অ্যাম্বার হিট হেলথ অ্যালার্ট জারি করা হয়েছিল, যা তীব্র গরমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়তি সতর্কতা হিসেবে কাজ করে। চলতি বছর যুক্তরাজ্য এ পর্যন্ত পঞ্চম তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে, আর বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের চরম আবহাওয়া ভবিষ্যতে আরও ঘনঘন ও তীব্র হতে পারে।
সূত্র: মেট্রো, ইয়াহু নিউজ ইউকে, ইউরোনিউজ
-
লণ্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটে বসছে স্থায়ী ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা
-
যুক্তরাজ্যে তীব্র খরা, পানি সাশ্রয়ে বিশেষজ্ঞদের জরুরি পরামর্শ
-
যুক্তরাজ্যে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব বাড়ছে, একক নৌকায় রেকর্ড ২৩০ জনের প্রবেশ
-
যুক্তরাজ্যে চশমা পরে গাড়ি চালানোর ডিভিএলএ নিয়ম ভাঙলে জরিমানা ১০০০ পাউন্ড
-
যুক্তরাজ্যে ৬৫ ঊর্ধ্বদের সঞ্চয়ে কর দেওয়া বেড়েছে চারগুণ