সিলেট নগরীর রায়নগরে একটি বাড়িতে তিনজন মানুষের রক্তাক্ত মৃত্যু দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। ঘটনার ছয় ঘণ্টার মধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ যে দ্রুততা দেখিয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু গ্রেপ্তারের পরপরই যেভাবে একটি ঝকঝকে 'প্রেমঘটিত হত্যাকাণ্ড'-এর চর্বিত বক্তব্য সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়ে নেটিজেনরাই মোটাদাগে প্রশ্ন তুলেছেন। এই ঘটনায় পুলিশ ও সাংবাদিকতার একাংশ-উভয়ই দায় এড়াতে পারে না।
- 'প্রেম' শব্দটি কার স্বার্থ রক্ষা করছে?
এই মামলার সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিকটি হলো নিহত গৃহকর্মীর প্রকৃত বয়স নিয়ে অস্পষ্টতা। কোনো প্রতিবেদনে তাকে 'অপ্রাপ্তবয়স্ক' বলা হয়েছে, কোথাও সরাসরি বয়স উল্লেখ করা হয়েছে পনেরো বছর। অথচ একই প্রতিবেদনে ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির সঙ্গে তার সম্পর্ককে অনায়াসে 'প্রেম কাহিনি' নামে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই ভাষা নিরপেক্ষ নয়। একটি নাবালিকার সঙ্গে বয়সে দ্বিগুণেরও বেশি একজন প্রাপ্তবয়স্কের সম্পর্ককে যখন সহজভাবে 'প্রেম' বলে বর্ণনা করা হয়, তখন তা প্রকৃতপক্ষে একটি সম্ভাব্য অপরাধকে 'রোমান্টিক আখ্যান' দিয়ে আড়াল করার শামিল হতে পারে।
অথচ নিহতের মা নিজেই এই তথাকথিত 'প্রেম'-এর বয়ান অস্বীকার করে মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার দাবি করেছেন। এই বক্তব্যকে প্রান্তিক করে রাখা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নয়।
কারও জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যোগ্যতা আমার নেই-তবে বুঝতে আমজনতার কোনো অসুবিধা হয়নি যে, এটিকে বহুলাংশে 'ভাইরাল কনটেন্ট' হিসেবে ব্যবহার করে কে কার আগে বেশি ভিউয়ের ব্যবসায় নামবেন, সে প্রতিযোগিতাই ছিল দৃশ্যমান।
- অপরাধদৃশ্যের যুক্তি ও প্রশ্নবিদ্ধ 'মোটিভ'
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী মূল দ্বন্দ্ব ছিল গৃহকর্মীর সঙ্গে বাবুলের মধ্যে, এবং বৃদ্ধ দম্পতি কথিতভাবে 'বাধা দিতে এসে' নিহত হন। কিন্তু অপরাধতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বক্তব্যে যৌক্তিক ফাঁক স্পষ্ট। ৮২ ও ৭৬ বছর বয়সী দুই প্রবীণ মানুষ একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের জন্য শারীরিকভাবে বড় কোনো প্রতিরোধ বা 'বাধা' হয়ে ওঠার কথা নয়। এমন পরিস্থিতিতে আততায়ীর পক্ষে সাধারণত পালিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা, বড়জোর পালানোর চেষ্টায় ধস্তাধস্তিতে কেউ আহত হতে পারতেন।
কিন্তু তিনজনকে পরপর হত্যা করার মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়া-বিশেষত যখন দুই ভুক্তভোগী বয়সের কারণে প্রকৃত হুমকি ছিলেন না-স্বাভাবিক যুক্তিতে খাপ খায় না। এই অসংগতি থেকেই প্রশ্ন ওঠে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি সত্যিই ব্যক্তিগত সম্পর্কের জের, নাকি তিনজনকেই 'সাক্ষী না রাখার' পরিকল্পিত উদ্দেশ্যে হত্যা করা হয়েছে; যা একটি ভিন্ন ও অধিকতর পরিকল্পিত মোটিভের দিকে ইঙ্গিত করে।
- প্রবাসী-মালিকানাধীন সম্পত্তি ও জমি দখলের প্রসঙ্গ শুরু থেকেই উচ্চারিত
সিলেটে প্রবাসী পরিবারের মালিকানাধীন জমি-সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, দখল ও হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত একটি বিষয়। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবাসী পরিবারের সন্তানদের অনুপস্থিতিতে দেশে থাকা প্রবীণ অভিভাবকরা প্রায়ই এ ধরনের বিরোধের মুখোমুখি হন, যেখানে আইনি লড়াই দীর্ঘায়িত করে অথবা ভয়ভীতি দেখিয়ে সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার প্রবণতা নতুন কিছু নয়।
এই মামলায় নিহত আব্দুস সাত্তারের দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে ও এক ছেলে-মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন—এই তথ্য একা দাঁড় করালে বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু রিকাবীবাজারের দীর্ঘদিনের সম্পত্তি বিরোধ ও আসন্ন শুনানির প্রেক্ষাপটে রাখলে এটি প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যে বিদ্যমান উদ্বেগকেই দ্বিগুণ জোরালো করে তোলে।
ঘটনার সময় বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরা বন্ধ থাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উধাও হয়ে যাওয়ার তথ্যকে নিছক কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ অপরাধদৃশ্য বা অনুসন্ধানি বিশ্লেষণের নিরিখে নেই। অথচ প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে এই সম্পত্তি-বিরোধের সূত্র অনেকটাই পার্শ্বকাহিনিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে মূল আলোচনার কেন্দ্রে রাখা হয়েছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জল্পনা।
- তদন্তাধীন মামলায় পুলিশের অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশ কতটা আইনসংগত?
একটি চলমান ফৌজদারি তদন্তে অভিযুক্তের জবানবন্দি, অপরাধের খুঁটিনাটি বিবরণ এবং আলামত সংক্রান্ত তথ্য গণমাধ্যমের কাছে অবাধে প্রকাশ করা আইনি ও তদন্তগত দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুতর প্রশ্নবিদ্ধ একটি চর্চা বলে মনে করছেন অভিজ্ঞরা। ফৌজদারি কার্যবিধি ও সাক্ষ্য আইনের মূল নীতি অনুযায়ী, অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগেই বিস্তারিত 'স্বীকারোক্তি' জনসমক্ষে প্রচার করা তদন্তের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করতে পারে, ভবিষ্যৎ বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে এবং অভিযুক্তের ন্যায্য বিচারের অধিকারকেও দুর্বল করতে পারে।
'অতি দ্রুত' ও 'অতি নিশ্চিত' ভাষায় ঘটনার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়া তদন্তের অন্যান্য সম্ভাব্য দিক-বিশেষত একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা বা সম্পত্তি-বিরোধ সংশ্লিষ্ট ষড়যন্ত্র-খতিয়ে দেখার সুযোগ সংকুচিত করে দিতে পারে বলে মোটাদাগে আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে সমাজসচেতন মহল, রাজনীতিবিদ ও পেশাজীবীরা তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দেওয়ার দায় তদন্তকারী সংস্থার ওপরই বর্তায়।
- দায়িত্বহীন 'মজা সাংবাদিকতা' ও অকাল রায়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এই মামলা নিয়ে যে ধরনের বিশ্লেষণ ছড়িয়ে পড়ছে, তার একটি বড় অংশ সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি ও তথ্যের সম্পূর্ণতা যাচাইয়ের ধার ধারছে না, এবং বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে ইন্টারনেট দুনিয়ায়, বিশেষ করে প্রবাসীদের মধ্যে, তুমুল সমালোচনা চলছে। তদন্ত অসম্পূর্ণ থাকা অবস্থায়, অভিযোগ 'আদালতে প্রমাণিত' না হওয়া সত্ত্বেও অনেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তমূলক ভাষায় 'কে দোষী, কেন দোষী' তা নির্ধারণ করে ফেলছেন।
এই প্রবণতা বিনোদনমূলক আকর্ষণ তৈরির পাশাপাশি কারও কারও জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগও করে দিয়েছে বটে, কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবার তথা সমাজের জন্য এর পরিণতি হয়েছে প্রচণ্ড নেতিবাচক।
নির্দোষ ব্যক্তিদের সম্মানহানি, প্রকৃত অপরাধী শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তি এবং জনমতের ওপর অন্যায্য প্রভাব-এসবের দায় মোটাদাগে তাদের ওপরই বর্তায়। যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইতিমধ্যে চলছে তুমুল সমালোচনা।
এই মামলায় পুলিশ ও কিছু গণমাধ্যম, উভয়ের ভূমিকাই প্রশ্নবিদ্ধ। পুলিশ যদি তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই বিস্তারিত 'স্বীকারোক্তি' প্রকাশ করে জনমতকে একটি নির্দিষ্ট দিকে ঠেলে দেয়, আর গণমাধ্যম যদি সেই বক্তব্য যাচাই ছাড়াই প্রচার করে প্রশ্নবিদ্ধ শব্দচয়নে ('প্রেম কাহিনি') একটি অপরাধকে রোমান্টিক আখ্যানে পরিণত করে, তাহলে ইচ্ছাকৃত না হলেও নিরপেক্ষতার দায়ের নিরিখে দুই পক্ষই ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি পেশাদার, স্বচ্ছ ও চাপমুক্ত তদন্ত-যেখানে সম্পত্তি বিরোধ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং সিসিটিভি বন্ধ থাকার মতো প্রতিটি সূত্র সমান গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হবে।
এই নির্মম তিন হত্যাকাণ্ডে যারা শিকার এবং যারা এতে জড়িত, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা ও মজা সাংবাদিকতায় লিপ্ত কিছু সংবাদকর্মী, সবাই আক্ষরিক অর্থে মানুষ। কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন প্রকৃত অর্থে মানবিক, তার একটি সহজ প্রমাণ ইতিমধ্যে আমরা পেয়েছি-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু সচেতন ও বিজ্ঞজনের সমালোচনায়।
বহুল উচ্চারিত একটি কথা দিয়েই এই লেখার ইতি টানছি-একজন ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় একজন মানুষ মারা যায়। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভুল সিদ্ধান্তে গোটা সমাজ কলুষিত হয়।
প্রতিটি মানুষ তার নাগরিক অধিকার ও আত্মমর্যাদা নিয়েই বাঁচুক-এটাই হোক সর্বজনীন চিন্তা ও প্রার্থনা। মানবিকবোধের চর্চায় দেশে-বিদেশে অনুকরণীয়, অগ্রণী সিলেটবাসী দুধে-ভাতে থাকুক-এটাই অগণনের প্রার্থনা।
আ নো য়া রু ল ই স লা ম অ ভি, কবি, সাংবাদিক, লন্ডন।