যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে অ্যান্ডি বার্নহাম বলেছেন, তাঁর ক্ষমতায় আসা ব্রিটেনের জন্য একটি ‘সার্কিট ব্রেকার’ মুহূর্ত হয়ে থাকবে। ডাউনিং স্ট্রিট থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে প্রথম ভাষণে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, তাঁর সরকার লাখ লাখ মানুষের মধ্যে নতুন করে আশা জাগিয়ে তুলবে।
কিয়ার স্টারমারের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী জানান, চলতি বছরের মধ্যেই তিনি একটি ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা উপস্থাপন করবেন, যার লক্ষ্য হবে ব্রিটেনকে বর্তমান অবস্থান থেকে সবাই যেখানে দেখতে চান, সেই জায়গায় নিয়ে যাওয়া। জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, মঙ্গলবার থেকেই মানুষকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ ঘোষণা শুরু করবেন তিনি।
চমক জাগিয়ে বার্নহাম রেচেল রিভসের স্থলাভিষিক্ত চ্যান্সেলর হিসেবে জন হিলিকে বেছে নেন, যা তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক অভিমুখ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিলি, যাঁর পদত্যাগ স্টারমারকে কোণঠাসা করে দিয়েছিল, এড মিলিব্যান্ড ও শাবানা মাহমুদের নাম আলোচনায় থাকার পরও শেষ পর্যন্ত সমঝোতামূলক প্রার্থী হিসেবে উঠে আসেন। বার্নহামের দল চেয়েছিল অভিজ্ঞ কেউ অর্থনীতির হাল ধরুক, যিনি রাজস্ব শৃঙ্খলা, পুনঃশিল্পায়ন, ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ, জীবনযাত্রার ব্যয় ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যগুলো একসঙ্গে সামলাতে পারবেন।
মন্ত্রিসভায় অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের মধ্যে মিলিব্যান্ড জ্বালানি ও নেট জিরো দায়িত্ব ছেড়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন, আর মাহমুদ রয়ে গেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। বার্নহামের ঘনিষ্ঠ সহযোগী লুইস হেই হয়েছেন ফার্স্ট সেক্রেটারি অব স্টেট ও চ্যান্সেলর অব দ্য ডাচি অব ল্যাঙ্কাস্টার, যিনি একটি সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভা পরিচালনা করবেন। এদিকে বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা মন্ত্রিসভা ছাড়ছেন বলে জানিয়েছেন, কেউ কেউ খোলাখুলিই বলেছেন যে বার্নহাম তাঁদের জানিয়ে দিয়েছেন আর প্রয়োজন নেই। এই তালিকায় আছেন রিভস, সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী ও বিচারমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি, হেই-এর সাবেক পদে থাকা ড্যারেন জোনস এবং আবাসনমন্ত্রী স্টিভ রিড।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশি ফোনালাপে বার্নহাম কথা বলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে, যিনি এর আগে তাঁকে নিছক ‘এক শহরের মেয়র’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। বার্নহাম আগামী বছরের জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে ট্রাম্পকে ম্যানচেস্টারে আমন্ত্রণ জানান। এছাড়া তিনি ফোনে কথা বলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডেয়ার লেয়েনের সঙ্গে।
ভাষণের পর সাংবাদিকদের বার্নহাম জানান, জ্বালানি বিল ও বাস ভাড়া কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে, যা হবে একটি পূর্ণ অর্থায়িত জীবনযাত্রার ব্যয় সহায়তা প্যাকেজের অংশ। ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতের ভাড়া স্থগিত রাখার মতো আরও কঠোর পদক্ষেপও এতে যুক্ত হতে পারে। তিনি বলেন, এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে যা এ বছরই মানুষ উপলব্ধি করতে পারবে এবং দ্রুতই তার প্রভাব টের পাবে। তবে এতে সব সমস্যার সমাধান হবে না বা সব চাপ দূর হবে না বলেও স্বীকার করেন তিনি, তবে এটি সরকারের অভিমুখ ও আন্তরিকতার প্রমাণ দেবে।
ভাষণে বার্নহাম জানান, ক্ষমতায় এসে তাঁর প্রথম নির্দেশনা হবে গৃহহীন মানুষের রাস্তায় রাত কাটানোর অবসান ঘটানো। সোমবার লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে গৃহহীনদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি এই অঙ্গীকার করেন। উল্লেখ্য, গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র থাকাকালে তিনি একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তবে সেই চার বছরে রাস্তায় গৃহহীনের সংখ্যা বরং বেড়েছিল।
বাকিংহাম প্যালেসে রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাতের পর আনুষ্ঠানিকভাবে স্টারমারের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেন বার্নহাম, যিনি গত এক দশকে যুক্তরাজ্যের ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। তিনি নিজেই স্বীকার করেন, এত ঘন ঘন নেতৃত্ব বদলের কারণে অনেক মানুষ রাজনীতির প্রতি বিরক্ত হয়ে পড়েছেন।
কোনো নোট ছাড়াই স্ত্রী মারি-ফ্রঁস ফন হেলের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, তিনি সচেতন যে গত ১০ বছরে এই সড়ক ধরে হেঁটে আসা তিনি ষষ্ঠ ব্যক্তি এবং ২০১৬ সালের পর সপ্তম প্রধানমন্ত্রী, যা তাঁর কাছে আত্মজিজ্ঞাসা ও নতুন সংকল্পের মুহূর্ত। তিনি বলেন, তাঁর প্রজন্মের রাজনীতিকদের নিজেদের মান আরও উঁচুতে তুলতে হবে এবং নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। ব্রিটেনকে বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে হবে যে তারা আবার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে, আর সেটাই তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জ—রাজনীতিকে আরও কার্যকর করে তোলা।
তিনি আরও বলেন, মানুষ রাজনীতির প্রতি যে বিরক্তি প্রকাশ করছেন, তা তিনি বোঝেন এবং সৎভাবে স্বীকার করছেন যে তাঁরা যথেষ্ট ভালো করতে পারেননি, তবে এখন থেকে তা বদলাবে।
গত শুক্রবার লেবার পার্টির নেতৃত্ব স্টারমারের কাছ থেকে গ্রহণ করা বার্নহাম যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোকে তাঁর পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন, যদিও রাজস্ব নীতির প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার কারণে আগামী নির্বাচনের আগে তাঁর হাতে কৌশলগত সুযোগ সীমিত। তিনি বলেন, এই মুহূর্তকে ব্রিটেনের জন্য একটি সার্কিট ব্রেকার মুহূর্তে পরিণত করা হবে, যা গত ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন বয়ে আনবে—একটি নতুন রাজনৈতিক মডেল এবং একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেল।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
-
প্রধানমন্ত্রী বার্নহামের মন্ত্রিসভা: চ্যান্সেলর হিলি, পররাষ্ট্রে মিলিব্যান্ড, স্বরাষ্ট্রে মাহমুদ
-
ইংল্যান্ডে এশীয় শিশুদের দাঁতে ক্ষয়ের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি
-
লন্ডনের মেয়র সাদিক খান পাচ্ছেন হাউস অব লর্ডসের সদস্যপদ, স্টারমারের শেষ সময়ের সিদ্ধান্তে
-
ডোভার সীমান্তে ইইউ-র নতুন নিয়মে দীর্ঘ যানজটের আশঙ্কা, রেকর্ড সংখ্যক ব্রিটিশ পর্যটকের যাত্রা
-
পানি-সংক্রান্ত সমস্যায় বন্ধ ইয়র্ক হল লেজার সেন্টার ও বি ওয়েল দ্য স্পা