ঢাকা ১ শ্রাবণ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
ঢাকা ১ শ্রাবণ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

যুক্তরাজ্যে হেলথ কেয়ার ওয়ার্কার ভিসা সংকট আরও ঘনীভূত, ILR সংস্কার নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরেই টানাপোড়েন

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম

যুক্তরাজ্যে হেলথ কেয়ার ওয়ার্কার ভিসা সংকট আরও ঘনীভূত, ILR সংস্কার নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরেই টানাপোড়েন

যুক্তরাজ্যের সামাজিক পরিচর্যা খাতে কর্মরত বিদেশি পরিচর্যা কর্মীদের জন্য নতুন করে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের স্পনসর অনুমোদন বাতিল হলে কর্মীরা সঙ্গে সঙ্গেই ওই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অধিকার হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে অন্য কোথাও অতিরিক্ত কাজ করে থাকলেও সেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতিও বাতিল হয়ে যাচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এক হাজার ৭১২টি স্পনসর অনুমোদন সাময়িক স্থগিত এবং এক হাজার ৫৪৫টি অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে। কঠোর তদারকির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সামাজিক পরিচর্যা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো।

স্পনসর অনুমোদন বাতিল হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ভিসার মেয়াদ সাধারণত ৬০ দিনে নামিয়ে আনা হয়, অথবা ভিসার অবশিষ্ট মেয়াদ যদি এর চেয়ে কম থাকে, তবে সেই সময় পর্যন্ত বৈধ থাকে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ায় কর্মীরা নতুন নিয়োগকর্তা খোঁজা বা অন্য ভিসা শ্রেণিতে আবেদন করার জন্য কিছু অতিরিক্ত সময় পান।

ইংল্যান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিচর্যা কর্মীদের সহায়তায় স্বাস্থ্য সামাজিক পরিচর্যা বিভাগ বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে। এর আওতায় ভিসার অবস্থা শ্রম অধিকার সম্পর্কে পরামর্শ, নতুন স্পনসর খুঁজে দেওয়ার চেষ্টা, চাকরি হারানোর কারণে আর্থিক সহায়তা সম্পর্কে তথ্য এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ রাখা হয়েছে।

তবে বাস্তবে নতুন স্পনসর পাওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন নিয়োগকর্তা পেলেও অনেক সময় স্পনসর সনদ বরাদ্দ না থাকায় আবেদন জমা দিতে দীর্ঘ বিলম্ব হয়। এই বরাদ্দ বাড়াতে অপেক্ষা করতে ১৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। দ্রুত অনুমোদনের জন্য প্রতিদিন ভোরে সীমিত সংখ্যক আবেদন গ্রহণ করা হয়, ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান সেই সুযোগও পান না।

এদিকে একটি অধিকারভিত্তিক সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক বছরের মধ্যে প্রায় ২৮ হাজার ৬২১ জন ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশি পরিচর্যা কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও মাত্র ৯৪১ জন বৈধ স্পনসর প্রতিষ্ঠানে নতুন চাকরি পেয়েছেন। অর্থাৎ সফলতার হার ছিল মাত্র দশমিক শতাংশ। পূর্ব ইংল্যান্ড অঞ্চলে তিন হাজার ১১১টি আবেদন এলেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পান মাত্র ৮২ জন।

এদিকে সংকটের সুযোগ নিয়ে প্রতারণার আশঙ্কাও বেড়েছে। চাকরি দেওয়ার নামে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা দালাল চক্রের মাধ্যমে অর্থ দাবি করা সম্পূর্ণ বেআইনি। কর্মীদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, চাকরির বিনিময়ে কোনো ধরনের অর্থ প্রদান করা উচিত নয় এবং সন্দেহজনক প্রস্তাব পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় কর্মীরা কেবল সরকারি আবেদন ফি এবং প্রয়োজনে দ্রুত সেবা গ্রহণের অতিরিক্ত ফি বহন করতে পারেন। কিন্তু স্পনসর অনুমোদন, স্পনসর সনদ, প্রশাসনিক ব্যয় বা প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য খরচ কর্মীদের কাছ থেকে আদায় করা আইনসম্মত নয়।

এছাড়া যারা যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে অবস্থান অব্যাহত রাখতে চান, তাদের বর্তমান অনুমতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন আবেদন করতে হবে অথবা অন্য উপযুক্ত ভিসা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সুযোগ খুঁজতে হবে। অন্যথায় তারা অবৈধভাবে অবস্থানকারীর মর্যাদায় পড়ে যেতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।

স্থায়ী বসবাসের নিয়ম নিয়ে সরকারের ভেতরেই মতবিরোধ

এই সংকট এমন এক সময়ে তীব্র হয়েছে, যখন স্বরাষ্ট্র সচিব শাবানা মাহমুদের প্রস্তাবিত স্থায়ী বসবাসের অনুমতি (ILR) সংস্কার নিয়ে সরকারের ভেতরেই টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। মার্চ মাসে ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে দশ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে, এবং এই নিয়ম যুক্তরাজ্যে বসবাসরত অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও পূর্ববর্তীভাবে প্রযোজ্য হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আসা প্রায় ছয় লাখ ১৬ হাজার পরিচর্যা কর্মী তাদের পরিবার আগের নিয়মে আগামী বছরই স্থায়ী বসবাসের জন্য যোগ্য হতেন, কিন্তু প্রস্তাবিত পরিবর্তনে সেই সুযোগ বাতিল হয়ে যেতে পারে।

এই প্রস্তাব ঘিরে সরকারের অভ্যন্তরেই প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। জুন মাসের শেষে অভিবাসন প্রতিমন্ত্রী মাইক ট্যাপ একটি সংবাদপত্রে লেখা নিবন্ধে যুক্তি দেন যে বিদেশি পরিচর্যা কর্মীদের এই সংস্কারের আওতা থেকে বাদ রাখা উচিত। এই মন্তব্যের জেরে শাবানা মাহমুদ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের কাছে ট্যাপকে বরখাস্ত করার আহ্বান জানান, তবে ডাউনিং স্ট্রিট তা প্রত্যাখ্যান করে এবং পরিবর্তে মন্ত্রীকে মন্ত্রিসভার আচরণবিধি মনে করিয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, পরিচর্যা কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ছাড় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি, বরং বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির অভ্যন্তরে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

এই মতবিরোধ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই প্রেক্ষাপটে যে, প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সম্ভাব্য উত্তরসূরি অ্যান্ডি বার্নহাম নিজেই ILR সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন, এবং বিষয়টিতে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। ফলে ILR সংস্কারের পূর্ণ রূপরেখা এবং তাতে পরিচর্যা কর্মীদের অবস্থান কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী সামগ্রিক ILR সংস্কার এই শরৎকালে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে, যা স্পনসর সংকটে ভুক্তভোগী পরিচর্যা কর্মীদের ভবিষ্যতকে আরও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিচ্ছে।

সূত্রঃ ফ্রি মুভমেন্ট, দ্য টাইমস, সিটি এএম