যুক্তরাজ্যের বহুল আলোচিত রচডেল গ্রুমিং গ্যাংয়ের নেতা শাবির আহমেদকে দেশ থেকে বহিষ্কার করার পথ তৈরি করতে অভিবাসন বিলে সংশোধনী আনছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। কমনওয়েলথভুক্ত দেশ থেকে পঞ্চাশ বছরেরও বেশি আগে যুক্তরাজ্যে আসা নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া ১৯৭১ সালের একটি আইনি বিধানের কারণে বর্তমানে আহমেদকে বহিষ্কার করা সম্ভব নয়।
মাহমুদের লক্ষ্য এই আইনি ফাঁক বন্ধ করে সন্ত্রাসবাদ, শিশু যৌন নিপীড়ন কিংবা মানব পাচারের মতো গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের বহিষ্কারযোগ্য করে তোলা—যদিও পাকিস্তান ইতিমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে তারা আহমেদকে ফিরিয়ে নিতে রাজি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
শিশুদের বিরুদ্ধে একাধিক যৌন অপরাধ, ধর্ষণসহ, প্রমাণিত হওয়ার পর চৌদ্দ বছর কারাভোগের পর সম্প্রতি (২ জুলাই) মুক্তি পেয়েছেন আহমেদ। ২০১২ সালে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল বারো বছর বয়সী শিশুসহ একাধিক কিশোরীর বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের দায়ে।
হোম অফিস জানিয়েছে, নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য একই মানদণ্ডের সঙ্গে এই আইনও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে। তবে যুদ্ধাপরাধী বা সংগঠিত অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের মতো সবচেয়ে গুরুতর ক্ষেত্র ছাড়া ওই প্রজন্মের অন্যদের জন্য বহিষ্কার থেকে সুরক্ষা বহাল থাকবে।
সোমবার সংসদে উত্থাপিত এই সংশোধনী পাস হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ১৯৭১ সালের আইনের অধীনে থাকা সুরক্ষা বাতিল করার ক্ষমতা দেবে। মাহমুদ সংসদে বলেন, এই আইন দীর্ঘমেয়াদি যুক্তরাজ্য বাসিন্দাদের সুরক্ষা দেয়, কিন্তু শাবির আহমেদের মতো ঘটনায় তা বহিষ্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, আহমেদকে বহিষ্কারের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিলে সব ধরনের উপায় অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
তবে সরকার নিজেই স্বীকার করেছে যে, আইন পরিবর্তন হলেও ইসলামাবাদ রাজি না হলে আহমেদকে বহিষ্কার করা যাবে না। জানা গেছে, পাকিস্তান আহমেদকে ফিরিয়ে নেওয়ার শর্ত হিসেবে যুক্তরাজ্য থেকে দুই রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীকে প্রত্যর্পণের দাবি জানাচ্ছে। এর আগে অ্যাঙ্গোলা, নামিবিয়া ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে সফল হয়েছিলেন মাহমুদ-ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়ার চার মাসের মধ্যেই তিন দেশ অবৈধ অভিবাসী ফিরিয়ে নিতে সহযোগিতা করতে রাজি হয়েছিল বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে।
বিরোধী দল কনজারভেটিভের ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলিপ সরকারের এই উদ্যোগে সমর্থন জানালেও, ৭৫ পাতার পূর্ণাঙ্গ অভিবাসন ও আশ্রয় বিল পাস হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে জরুরি আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন। রচডেলের লেবার সংসদ সদস্য পল ওয়াহ সংসদে বলেন, কূটনৈতিক যত বাধাই থাকুক, তা অতিক্রম করতে হবে, কারণ এই বহিষ্কারের পক্ষে জনস্বার্থ স্পষ্ট। তিনি আরও বলেন, আহমেদের শিকার হওয়া মেয়েরা বছরের পর বছর সেসব প্রতিষ্ঠানের কাছেই উপেক্ষিত হয়েছিল, যাদের তাদের রক্ষা করার কথা ছিল।
অভিবাসন বিলে আরও যেসব বড় পরিবর্তন আসছে
শুধু আহমেদের বহিষ্কার-প্রশ্নেই নয়, পুরো অভিবাসন ও আশ্রয় বিলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের (ইসিএইচআর) অনুচ্ছেদ ৮ অভিবাসন ও বহিষ্কার সংক্রান্ত মামলায় আদালত কীভাবে প্রয়োগ করতে পারবে, তাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে-মাহমুদের অভিযোগ, এই ধারাটি এতদিন অপব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
স্বতন্ত্র আদালত ব্যবস্থা তুলে দিয়ে আশ্রয় সংক্রান্ত আপিলের জন্য নতুন একটি কাঠামো চালু করা হবে। পাশাপাশি শরণার্থীদের জন্য কমিউনিটি স্পনসরশিপসহ নতুন বৈধ পথও ঘোষণা করেছেন মাহমুদ।
সংসদে মাহমুদ বলেন, "এই দেশ সবসময় যুদ্ধ ও নিপীড়নের শিকার মানুষদের আশ্রয় দিয়ে এসেছে, এবং এ নিয়ে আমি গর্বিত। কিন্তু আমাদের মেনে নিতে হবে যে আমাদের আশ্রয় ব্যবস্থার প্রতি জনসমর্থন ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার না করলে ব্রিটিশ জনগণের সমর্থন সম্পূর্ণভাবে হারাব।"
তিনি আরও বলেন, এই পরিবর্তনগুলো আশ্রয় ব্যবস্থায় ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনবে—যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের প্রতি যেমন, তেমনি যেসব সম্প্রদায় ইতিমধ্যে এই দায়ভার বহন করে আসছে তাদের প্রতিও।
সবচেয়ে বিতর্কিত প্রস্তাবিত পরিবর্তনটি হলো-স্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজের অধিকার (ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন বা আইএলআর) পাওয়ার জন্য অপেক্ষার সময় পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে দশ বছর করা। এই পরিবর্তনের জন্য আলাদা আইন প্রণয়নের প্রয়োজন নেই, এবং সরকারের পরামর্শ প্রক্রিয়ার জবাব পাওয়ার পর বছরের শেষ নাগাদ এটি চূড়ান্ত করা হবে বলে মাহমুদ জানিয়েছেন।
বিবেচনাধীন একটি বিকল্প অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে থাকা ব্যক্তিরা পাঁচ বছর পরই আইএলআরের যোগ্য হতে পারবেন, তবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা দাবি করার জন্য তাদের অতিরিক্ত কিছু সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।
প্রায় আশি জন লেবার সংসদ সদস্য একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই নীতি প্রযোজ্য না করার জন্য, একে "আমাদের পরিচয়, আমাদের অবস্থান এবং রাজনীতি করার পদ্ধতির পরিপন্থী" বলে অভিহিত করে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, অভিবাসন সংক্রান্ত অধিকাংশ পরিবর্তনের প্রতি সমর্থন রয়েছে, এবং আশা করা হচ্ছে সোমবারের ভোটাভুটিতে বড় ধরনের বিদ্রোহের মুখোমুখি হতে হবে না সরকারকে, যদিও কিছু সংসদ সদস্য ভোটদানে বিরত থাকতে পারেন।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, আইটিভি নিউজ, প্রেস অ্যাসোসিয়েশন
-
আদালতের রায় মানছে না হোম অফিস, পাচারের শিকারদেরও ফ্রান্সে পাঠানো হচ্ছে
-
গ্রেটার বড়লেখা এসোসিয়েশন ইউকে'র নতুন কমিটি নির্বাচিত
-
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ইহুদি সম্প্রদায়ের সুরক্ষায় ২৫০ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ করছে হোম অফিস
-
যুক্তরাজ্যে ইসলামিক সমাবেশে হামলার সন্দেহে ১২ জন গ্রেপ্তার, ৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
-
নির্মাণ শিল্পে ক্যারিয়ার গড়তে চান তরুণরা: টাওয়ার হ্যামলেটসের মেলায় অভাবনীয় সাড়া
আরও পড়ুন: