যুক্তরাজ্যকে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগে বিশেষ ভিসা সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ব্রিটিশ সরকার। চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস ও ব্যবসা সচিব পিটার কাইল যৌথভাবে এই উদ্যোগের ঘোষণা দেন। সরকারের লক্ষ্য, দ্রুত বর্ধনশীল ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখা এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের প্রথম "ট্রিলিয়ন ডলার" কোম্পানি গড়ে তোলা।
কী সুবিধা পাবেন
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, যোগ্য কোম্পানিগুলো বিদেশ থেকে দক্ষ কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাজ্যে আনার ক্ষেত্রে ভিসা-সংক্রান্ত ব্যয়ের জন্য কর্মীপ্রতি সর্বোচ্চ ৫,০০০ পাউন্ড পর্যন্ত সরকারি সহায়তা পাবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বছরে সর্বোচ্চ ২৫,০০০ পাউন্ড পর্যন্ত এই রিফান্ড সুবিধা নিতে পারবে — অর্থাৎ বছরে পাঁচজন পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ কর্মীর জন্য এই সহায়তা পাওয়া সম্ভব।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে চালু হচ্ছে নতুন 'কনসিয়ার্জ সার্ভিস'। ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে নিয়ন্ত্রক বাধা, অর্থায়ন সংকট বা সরকারি চুক্তি-সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত সমাধানে এই সেবা কাজ করবে। পাশাপাশি স্পনসর লাইসেন্সের আবেদন এখন মাত্র ১০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হবে, যেখানে আগে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস লেগে যেত।
কোন খাতে প্রযোজ্য
এই সুবিধা সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত নয়। কেবল ডিজিটাল ও প্রযুক্তি, জীবন বিজ্ঞান এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে কার্যরত উচ্চ প্রবৃদ্ধির কোম্পানিগুলোই এই সুবিধা পাবে। বিদ্যমান বাজেট থেকে 'আগে আসলে আগে পাবেন' ভিত্তিতে অনুদান বিতরণ করা হবে। সফল উদ্যোক্তা পেনি ভার্বেককে সরকারের বিশেষ 'স্কেল-আপ উপদেষ্টা' হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
কেন এই উদ্যোগ
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের মোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মাত্র ০.৮ শতাংশ দ্রুত বর্ধনশীল স্কেল-আপ কোম্পানি হলেও ২০২৩ সালে এই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন পাউন্ডের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে এবং প্রায় ৩৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
সমালোচনা ও বিতর্ক
এই উদ্যোগ ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশে যখন ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ১০ লাখ তরুণ বেকার অথবা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বাইরে অবস্থান করছেন, তখন বিদেশি কর্মীদের পেছনে সরকারি অর্থ ব্যয় করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দল ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ সংগঠনগুলো। মাইগ্রেশন ওয়াচ ইউকে এবং বিরোধী নেতারা এটিকে "পেছনের দরজা দিয়ে সস্তা শ্রমিক আমদানি" বলে অভিহিত করেছেন।
ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্সের গবেষক ক্যালাম প্রাইস বলেন, "কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বদলে যুক্তরাজ্যকে সামগ্রিকভাবে উচ্চ দক্ষ কর্মীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলাই অধিকতর কার্যকর হতো।"
তবে চ্যান্সেলর রিভস এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্রিটিশ কর্মীদের চাকরি কেড়ে নেওয়া নয়, বরং ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাজ্যের অবস্থান শক্তিশালী করা। স্থানীয় তরুণদের জন্য সরকার ইতিমধ্যে ২.৫ বিলিয়ন পাউন্ডের যুব কর্মসংস্থান কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করছে বলে জানান তিনি।
অভিবাসন নীতিতে মতপার্থক্য
অভিবাসন নীতি নিয়ে লেবার পার্টির ভেতরেও মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমানে বৈধভাবে বসবাসরত অভিবাসীদের জন্য স্থায়ী বসবাসের নিয়ম পূর্ববর্তীভাবে পরিবর্তন করা উচিত হবে না। সরকারের বিবেচনায় থাকা নতুন প্রস্তাবে স্থায়ী বসবাসের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হতে পারে। স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা ভিসাধারীদের ক্ষেত্রে তা ১৫ বছর এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলদের জন্য ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্য একদিকে আন্তর্জাতিক প্রতিভা আকর্ষণের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে দেশীয় কর্মসংস্থান ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে। ফলে নতুন ভিসা সহায়তা কর্মসূচি অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিকভাবে ততটাই বিতর্কিত হয়ে উঠেছে।
-
লন্ডনে বাবু-রুপাসহ গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের নিন্দা
-
প্রিন্স উইলিয়ামের কাছ থেকে এমবিই সম্মাননা গ্রহণ করলেন আবু তাহের
-
যুক্তরাজ্যে কেন বারবার প্রধানমন্ত্রী বদলাচ্ছে? স্টারমারের পর কে?
-
সাংবাদিক ফয়সল মাহমুদের মায়ের ইন্তেকাল, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব পরিবারের শোক
-
নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর স্টারমারের পাশে গর্ডন ব্রাউন ও হ্যারিয়েট হারম্যান