সিলেটের মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে এক নববিবাহিত তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় প্রায় পাঁচ বছর দশ মাস পর বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে জনাকীর্ণ এজলাসে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড এবং শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম তারেক ও অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল ও মাহফুজুর রহমানকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামিকে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড এবং অপর একটি ধারায় চৌদ্দ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের সঙ্গে আরও পঞ্চাশ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছেন। অর্থাৎ তিন আসামির কাছ থেকে মোট চার লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে তা ভুক্তভোগীকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
এছাড়া জব্দ করা একটি প্রাইভেট কার অভিযোগকারীকে ফেরত দেওয়া, দাবিদার না থাকায় একটি মোটরসাইকেল রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা এবং সাইফুর রহমানের কক্ষ থেকে জব্দ করা দুটি মোবাইল ফোন তার পরিবারকে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। অন্য কোনো মামলায় আটকাদেশ না থাকলে খালাসপ্রাপ্তদের মুক্তিরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- যে রাত বদলে দিয়েছিল দুই মানুষের জীবন
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় শাহপরান মাজার এলাকা থেকে ফেরার পথে দক্ষিণ সুরমার এক নবদম্পতির প্রাইভেট কার এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে থামিয়ে কয়েকজন যুবক তাদের ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। সেখানে স্বামীকে আটকে রেখে গাড়ির ভেতরে তরুণীকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়, পাশাপাশি দম্পতির কাছ থেকে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়া ও তাদের গাড়ি আটকে রাখারও অভিযোগ ওঠে। খবর পেয়ে রাত সাড়ে দশটার দিকে পুলিশ দম্পতিকে ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধার করে এবং নির্যাতনের শিকার তরুণীকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়।
ঘটনার রাতেই ভুক্তভোগীর স্বামী শাহপরান থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে ও দুজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করেন। তদন্তে আরও দুইজনের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হলে মোট আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, দণ্ডিত ও খালাসপ্রাপ্ত সব আসামিই তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সিলেট নগরের টিলাগড়কেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এছাড়া ঘটনার পর অভিযান চালিয়ে পুলিশ সাইফুর রহমানের কক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করে, যার ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে পৃথক একটি অস্ত্র মামলাও দায়ের হয়। গাড়ি আটকে রেখে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে দায়ের করা আরেকটি মামলাও এই মামলার সঙ্গে একত্রে বিচার করা হয়েছে।
২০২১ সালের ৩ ডিসেম্বর শাহপরান থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন। পরে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের পর অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের পর্যায়ে পৌঁছায়। বিচার চলাকালে মোট চব্বিশ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়, যাদের মধ্যে ছিলেন নির্যাতনের শিকার তরুণী নিজে, তার স্বামী, তদন্ত কর্মকর্তা, বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট, এমসি কলেজের একজন শিক্ষক এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের একজন চিকিৎসক।
- প্রতিষ্ঠানের দায় নিয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
ঘটনার পরের বছরই এই মামলার সূত্র ধরে হাইকোর্ট এমসি কলেজ কর্তৃপক্ষের দায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে আদালত জানিয়েছিলেন, ছাত্রাবাসে হোস্টেল সুপার ও প্রহরীদের দায়িত্বে অবহেলা ছিল এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে অধ্যক্ষও এই দায় এড়াতে পারেন না।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কলেজ বন্ধ থাকার পরও বেশ কয়েকজন প্রাক্তন ছাত্র বেআইনিভাবে হোস্টেলের সিট দখল করে অবস্থান করছিলেন, এমনকি সাইফুর রহমান নিজে হোস্টেল সুপারের বাসভবনও জোরপূর্বক দখল করে রেখেছিলেন। এই অনিয়মই ছাত্রাবাস এলাকায় এমন জঘন্য অপরাধ সংঘটনের সুযোগ তৈরি করেছিল বলে আদালত মন্তব্য করেছিলেন।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্ররাজনীতির নামে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য এবং হোস্টেল ব্যবস্থাপনার শিথিলতা যে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এই মামলা তার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।
- দেশজুড়ে প্রতিবাদ, দ্রুত বিচারের দাবিতে আন্দোলন
ঘটনার পরপরই সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং নারী অধিকারকর্মীরা রাজপথে নামেন। মানববন্ধন, বিক্ষোভ, মশাল মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশে একটাই দাবি ছিল—দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন বিচারপ্রক্রিয়া যেন দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে না যায়, সে দাবিতে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার ছিল। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই জনমত ও নাগরিক চাপ মামলাটিকে জনদৃষ্টির বাইরে চলে যেতে দেয়নি। তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচারিক কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপ গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ নিবিড়ভাবে অনুসরণ করেছে। যদিও আদালতের রায় প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতেই হয়, তবু জনসচেতনতা ও গণমাধ্যমের ধারাবাহিক নজরদারি বিচারপ্রক্রিয়াকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিচারের রায়, কিন্তু কী শেষ হলো ভুক্তভোগীর লড়াই?
রায়ের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তির প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও ভুক্তভোগী নারী ও তার পরিবারের বাস্তব জীবন সংগ্রাম এখানেই শেষ হয়ে যায় না। যৌন সহিংসতার শিকার একজন নারীকে শুধু শারীরিক নয়, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারকে স্থান পরিবর্তন করতে হয়, পরিচয় গোপন রেখে নতুন জীবন শুরু করতে হয়, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সম্পর্কেও বিরূপ প্রভাব পড়ে।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া-প্রায় ছয় বছরের অপেক্ষা-নিজেই একটি মানসিক চাপ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের বহু মানবাধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্য বিচার যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক সহায়তা।
- সাড়ে চার লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ-এরপর?
আদালত তিন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির কাছ থেকে মোট চার লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে তা ভুক্তভোগীকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এই অর্থ কীভাবে আদায় হবে, দণ্ডিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ আদায় সম্ভব না হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিংবা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত কোনো পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকবে কি না-এসব বিষয়ে রায়ে বিস্তারিত উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের নির্দেশে জরিমানা ধার্য হলেও তা আদায়ের বাস্তব প্রক্রিয়া এবং ভুক্তভোগীর হাতে অর্থ পৌঁছানো অনেক সময় পৃথক প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে।
- অর্থ কি ফিরিয়ে দিতে পারে হারানো মর্যাদা?
চার লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা কোনো পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থ হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়-এমন একটি নৃশংস অপরাধের পর একজন নারীর হারানো নিরাপত্তাবোধ, মানসিক শান্তি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ কি অর্থ দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব? এর উত্তর নিঃসন্দেহে না। ক্ষতিপূরণ বিচার ব্যবস্থার একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই সংঘটিত অপরাধের সমতুল্য প্রতিকার নয়। যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, মানসিক পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা।
এই প্রতিবেদনে যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, নৈতিক সাংবাদিকতার নীতিমালা এবং ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে।
-
কিউআরএস টিমের সভা : দেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে
-
কামরানের লাশ দেশে আনতে এগিয়ে এলেন প্রবাসীরাই, প্রশ্নে সরকারি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন
-
যেকারণে বিমান থেকে নামিয়ে যুক্তরাজ্যগামী নারী গ্রেপ্তার
-
শাহজালালের মাজারে দানবাক্সে ১৯ দিনে ৪৭ লাখ টাকা, মিলল সোনা-রুপা ও ১২ দেশের মুদ্রা
-
লস এঞ্জেলেসে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশির মৃত্যু
আরও পড়ুন: