৫২বাংলা ডেস্ক | লন্ডন
অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। ২০২৬ সালের ১৩ মে রাজকীয় ভাষণে ঘোষিত এবং সম্প্রতি সংসদে উপস্থাপিত নতুন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম বিলে বলা হয়েছে, অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে গড়ে তোলা পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে মানবাধিকার আইনের সুরক্ষা দাবি করে বহিষ্কার (Deportation) ঠেকানোর সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা হবে।
- আর্টিকেল ৮ নিয়ে কী পরিবর্তন আসছে
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের নেতৃত্বে আনা সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের (ECHR) আর্টিকেল ৮ - যা একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অধিকার নিশ্চিত করে-সেটির প্রয়োগে বড় পরিবর্তন আনা হবে।
নতুন বিলে "পারিবারিক জীবন" সংজ্ঞাটি সংকুচিত করা হয়েছে। এখন থেকে শুধু একসঙ্গে বসবাসকারী স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা এবং ১৮ বছরের কম বয়সী সন্তানকেই "মূল পারিবারিক একক" হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান বা ভাই-বোনের সম্পর্ক আর পারিবারিক জীবনের অন্তর্ভুক্ত থাকবে না।
সরকারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কিছু অবৈধ অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থী এই বিধান ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যে থাকার সময় বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। নতুন পরিবর্তনের লক্ষ্য হলো সেই সুযোগ সীমিত করা এবং অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধ করা।
- অবৈধ অবস্থানে গড়া পরিবার আর সুরক্ষা দেবে না
নতুন নীতিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যখন যুক্তরাজ্যে থাকার বৈধ অধিকার ছাড়াই অবস্থান করছেন, সে সময়ে গড়ে ওঠা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সম্পর্ককে সাধারণভাবে বহিষ্কার ঠেকানোর ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হবে না। অর্থাৎ, অবৈধভাবে বসবাসের সময় পরিবার গঠন বা সম্পর্ক স্থাপন করলে তা আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশে থাকার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে না।
তবে যেসব ক্ষেত্রে আবেদনকারী প্রকৃতপক্ষে নিজের সন্তান বা জীবনসঙ্গীর সঙ্গে একই ছাদের নিচে বসবাস করেন এবং পরিস্থিতি ব্যতিক্রমধর্মী, সেসব ক্ষেত্রে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করতে পারবে। বিলে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র তিনটি সংকীর্ণ পথে ব্যতিক্রম প্রযোজ্য হবে - দীর্ঘ ও বৈধ বসবাস, যোগ্য সঙ্গী বা সন্তানের সঙ্গে প্রকৃত সম্পর্ক যেখানে বহিষ্কার অসহনীয় কঠোর হবে, এবং অন্যান্য অত্যন্ত বাধ্যকারী পরিস্থিতি।
হোম অফিসের এক মুখপাত্র বলেন, "অভিবাসন ব্যবস্থা না মেনে চলার জন্য কাউকে পুরস্কৃত করা উচিত নয়। এই সংস্কারের মাধ্যমে বৈধ অধিকার ছাড়া অবস্থানকালে গড়ে ওঠা পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যে থেকে যাওয়ার সুযোগ সীমিত করা হবে।"
- সংখ্যায় সংকটের চিত্র
হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত বছরই আর্টিকেল ৮-এর ভিত্তিতে ৩৪,৪০০ আশ্রয়প্রার্থী যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি পেয়েছেন এবং এই ৩৪,৪০০ ব্যক্তির আজীবন সেবায় ব্রিটিশ করদাতাদের ব্যয় হবে প্রায় ৫০০ কোটি পাউন্ড।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, নতুন আইন কার্যকর হলে অবৈধ অভিবাসীদের দায়ের করা আপিলের মধ্যে অতিরিক্ত প্রায় ১১ হাজার ৭০০টি আবেদন প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। তবে একই সঙ্গে সরকারি নথিতে সতর্ক করা হয়েছে যে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলেও ব্যর্থ আবেদনকারীদের প্রায় ৫৫ শতাংশ দেশ ছেড়ে নাও যেতে পারেন।
- নতুন আপিল ব্যবস্থা: বিচারক ছাড়াই সিদ্ধান্ত
প্রস্তাবিত বিলে বর্তমান ফার্স্ট-টায়ার ট্রাইব্যুনালের পরিবর্তে 'ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইমিগ্রেশন অ্যাপিলস অথরিটি' (IIAA) নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করা হবে, যা আশ্রয় আপিল পরিচালনা করবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আবেদনকারীকে তার সব আইনি যুক্তি একবারেই উপস্থাপন করতে হবে। বারবার নতুন আপিল করে যুক্তরাজ্যে থাকার সময় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত করা হবে।
- চিশিনাউ ঘোষণা: ইউরোপজুড়ে একই সুর
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ১৫ মে কাউন্সিল অব ইউরোপের ১৩৫তম অধিবেশনে ৪৬টি সদস্য রাষ্ট্র 'চিশিনাউ ঘোষণা' গ্রহণ করেছে। এই ঘোষণায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে আর্টিকেল ৮-এর অধীনে বহিষ্কার বৈধভাবেই পারিবারিক জীবনের অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে পারে - যদি তা আইনসম্মত, বৈধ লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক এবং গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় হয়। এই ঘোষণা যুক্তরাজ্য সরকারের অবস্থানকে আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থন যোগিয়েছে।
- অস্থায়ী শরণার্থী মর্যাদা ও মর্ডান স্লেভারি আইনে পরিবর্তন
সরকার অস্থায়ী শরণার্থী মর্যাদা চালুরও প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমান পাঁচ বছরের শরণার্থী সুরক্ষার পরিবর্তে 'কোর প্রোটেকশন স্ট্যাটাস' নামে ৩০ মাসের একটি অস্থায়ী মর্যাদা চালু করা হচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
এ ছাড়া মর্ডান স্লেভারি অ্যাক্টের অধীনেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আধুনিক দাসত্বের শিকার হওয়ার দাবি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দাখিল করতে হবে। নির্ধারিত সময় অতিক্রম করলে সেই দাবি গ্রহণে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে।
- বিরোধীদের অবস্থান
বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিল্প দাবি করেছেন, লেবার সরকারের এই পরিবর্তন যথেষ্ট নয় এবং এতে অবৈধ অভিবাসন কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। তার মতে, সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সতর্ক করছেন যে, অনেক ক্ষেত্রে হোম অফিসের সমন্বয়ের অভাব ও প্রশাসনিক ত্রুটিই বহিষ্কার ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ -ECHR নয়।
প্রস্তাবিত এই পরিবর্তনগুলো কার্যকর করতে বিলটি সংসদে পাস হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।
সূত্র: জিবি নিউজ, Free Movement, The Conversation, Electronic Immigration Network, House of Commons Library
৫২বাংলা | 52banglatv.com
-
যুক্তরাজ্যে প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটলেই কেনাকাটায় মিলবে ছাড়!
-
‘ল্যাম্ব’ কাবাবে ছাগল, চামড়া ও চর্বি : যুক্তরাজ্যের এক প্রতিষ্ঠানের ৫ লাখ পাউন্ড জরিমানা
-
ইংল্যান্ডে প্রসূতি ও নবজাতক সেবার চরম বিপর্যয়: 'অ্যামোস রিভিউ'র চাঞ্চল্যকর তথ্য
-
যুক্তরাজ্যে ভ্যাট কমলে বাঁচতে পারে রেস্তোরাঁ-পাব শিল্প, কিন্তু বিল কে দেবে?
-
ইউনিভার্সাল ক্রেডিট যুগে বড় পরিবর্তন: ডিডব্লিউপি নিশ্চিত করল দুই জনপ্রিয় ভাতার সমাপ্তি