আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ৫২বাংলা
‘ল্যাম্ব ডোনার কাবাব’ (খাসির কাবাব) কিনে খাচ্ছেন ভেবে বছরের পর বছর আসলে ছাগলের মাংস, পশুর চামড়া, অতিরিক্ত চর্বি ও নিম্নমানের মাংসের টুকরা খেয়েছেন যুক্তরাজ্যের লাখো মানুষ। এমনই এক চাঞ্চল্যকর খাদ্য জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে দেশটির অন্যতম বৃহৎ ডোনার কাবাব প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান Kismet Kebabs Ltd–এর বিরুদ্ধে।
ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব কাবাবের মোড়কে ‘৭০ শতাংশ খাসির মাংস’ থাকার দাবি করা হয়েছিল, সেগুলোতে প্রকৃতপক্ষে ১০ শতাংশেরও কম ভেড়া বা খাসির মাংসের উপস্থিতি ছিল। দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রতিষ্ঠানটি আদালতে প্রতারণার অভিযোগ স্বীকার করলে তাদের ৫ লাখ পাউন্ড জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি মামলার ব্যয় হিসেবে আরও ২ লাখ ৫৯ হাজার ২৯৮ পাউন্ড পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
- ডিএনএ পরীক্ষায় ফাঁস জালিয়াতি
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ ও ২০২১ সালে। ওয়েলসের সোয়ানসি শহরে টেকঅ্যাওয়ে দোকান থেকে এলোমেলোভাবে সংগ্রহ করা ডোনার কাবাবের নমুনায় ডিএনএ পরীক্ষা চালায় স্থানীয় ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস বিভাগ।
পরীক্ষায় দেখা যায়, ‘৭০ শতাংশ ল্যাম্ব’ হিসেবে বিক্রি হওয়া কাবাবে খাসির মাংসের উপস্থিতি ছিল ১০ শতাংশেরও কম। এরপর তদন্তের পরিধি বাড়ানো হয়।

- কারখানায় গিয়ে মিলল না খাসির মাংস
২০২১ সালের মে মাসে ইংল্যান্ডের এসেক্সের ল্যাচিংডনে অবস্থিত কিসমেট কাবাবসের কারখানায় অভিযান চালান তদন্ত কর্মকর্তারা।
সোয়ানসি ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস কর্মকর্তা রিস হ্যারিস জানান, কারখানায় গিয়ে তারা কার্যত কোনো খাসির মাংসই পাননি। সেখানে ছিল ছাগলের মাংস, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংসের টুকরা, পশুর চামড়া, চর্বি, পুরোনো মাটনের অংশ এবং বিভিন্ন নিম্নমানের উপকরণ।
তার ভাষায়, এসব উপাদান বিশাল মাংস পেষণযন্ত্রে মিশিয়ে এমন এক পেস্ট তৈরি করা হতো, যা দেখতে অনেকটা শিশুদের খেলনা ‘প্লে-ডো’–এর মতো।
পরে সেই মিশ্রণ বড় বড় কাবাবের শিকে লাগিয়ে ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ খাসির মাংস রয়েছে—এমন লেবেল লাগিয়ে বাজারজাত করা হতো।
- একই মাংস, ভিন্ন লেবেল
তদন্তকারীরা একটি উৎপাদন লাইনে দেখতে পান, একই ট্রে থেকে নেওয়া কাবাবের মিশ্রণ দুটি আলাদা প্যাকেটে ভরা হচ্ছে। একটি প্যাকেটে লেখা হচ্ছে ‘৭০% ল্যাম্ব’, অন্যটিতে ‘৫০% ল্যাম্ব’।
রিস হ্যারিস বলেন, পণ্যের গায়ে যে তথ্য লেখা ছিল, তার সঙ্গে ভেতরের উপাদানের কোনো মিলই ছিল না। এটি ছিল পরিকল্পিত খাদ্য জালিয়াতি। ভোক্তা ও পাইকারদের কাছ থেকে উন্নতমানের পণ্যের দাম নেওয়া হলেও সরবরাহ করা হচ্ছিল নিম্নমানের উপকরণ।
- রেসিপিতেই ছিল না খাসির মাংস
তদন্তে উদ্ধার হওয়া প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ‘রেসিপি কার্ড’ বিশ্লেষণ করে কর্মকর্তারা দেখতে পান, কিছু তথাকথিত ‘ল্যাম্ব কাবাব’-এর রেসিপিতে খাসির মাংসের অস্তিত্বই ছিল না। বরং সেখানে ব্যবহার করা হতো ছাগলের মাংস, গরুর চর্বি এবং মুরগির ড্রামস্টিক। তদন্তকারীদের মতে, এটি ছিল সুপরিকল্পিত প্রতারণা।
- কোটি কোটি টাকার প্রতারণা
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সাল থেকে চলা এই জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬০ লাখ পাউন্ড (প্রায় ১১০ কোটি টাকার বেশি) আয় করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কত পরিমাণ কাবাব বাজারে সরবরাহ করা হয়েছে, তার হিসাব মিলাতে ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস বিভাগের দুই কর্মকর্তার ১৮ মাস সময় লেগেছে।
প্রতিষ্ঠানটি প্রতি সপ্তাহে ১০০ টনেরও বেশি বিভিন্ন ধরনের কাবাব উৎপাদন করে এবং যুক্তরাজ্যের প্রায় সব অঞ্চলে সরবরাহ করে থাকে।
- ‘হর্সমিট কেলেঙ্কারির’ সঙ্গে তুলনা
তদন্ত কর্মকর্তা রিস হ্যারিস বলেন, ঘটনার ব্যাপকতা ২০১৩ সালের ইউরোপজুড়ে আলোচিত ‘হর্সমিট স্ক্যান্ডাল’-এর সঙ্গে তুলনীয়। ওই ঘটনায় গরুর মাংসের পণ্যে ঘোড়ার মাংস পাওয়া যাওয়ায় ইউরোপজুড়ে বহু খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
সোয়ানসি ক্রাউন কোর্টের বিচারক হিউ রিস বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি ‘উল্লেখযোগ্য মাত্রার অসততা’ ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। আদালত প্রতিষ্ঠানটিকে ৫ লাখ পাউন্ড জরিমানা এবং ২ লাখ ৫৯ হাজার ২৯৮ পাউন্ড মামলা পরিচালনার ব্যয় পরিশোধের নির্দেশ দেন।
- খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থার বক্তব্য
যুক্তরাজ্যের ফুড স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সি (FSA) জানিয়েছে, এ ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক নমুনা পরীক্ষা খাদ্য জালিয়াতি শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংস্থাটির ন্যাশনাল ফুড ক্রাইম ইউনিটের প্রধান অ্যান্ড্রু কুইন বলেন, খাদ্য অবশ্যই নিরাপদ এবং সঠিকভাবে লেবেলযুক্ত হতে হবে। খাদ্যে ভেজাল বা ভুল তথ্য দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।
- কিসমেট কাবাবসের ব্যাখ্যা
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, অভিযোগগুলো পাঁচ বছর আগের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তখন প্রতিষ্ঠানটি ভিন্ন ব্যবস্থাপনার অধীনে পরিচালিত হতো। এক বিবৃতিতে কিসমেট কাবাবস জানায়, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন ব্যবস্থা ও পরিচালন কাঠামো সম্পূর্ণ পরিবর্তন করা হয়েছে। তারা আরও জানায়, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড BRCGS–এর স্বীকৃতি অর্জন করেছে। আদালতের কার্যক্রমের পর তাদের সনদ পুনর্মূল্যায়ন করা হলেও সর্বশেষ পর্যালোচনায় তারা মানদণ্ড পূরণ করেছে বলে বিবেচিত হয়েছে।
সূত্র: BBC News, Swansea Trading Standards, Food Standards Agency (FSA)
-
যুক্তরাজ্যে ভ্যাট কমলে বাঁচতে পারে রেস্তোরাঁ-পাব শিল্প, কিন্তু বিল কে দেবে?
-
ইউনিভার্সাল ক্রেডিট যুগে বড় পরিবর্তন: ডিডব্লিউপি নিশ্চিত করল দুই জনপ্রিয় ভাতার সমাপ্তি
-
অবৈধ কর্মী নিয়োগে পূর্ব লন্ডনের ২০ প্রতিষ্ঠানকে লাখ লাখ পাউন্ড জরিমানা
-
যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের বিলাসবহুল ও নতুন বাড়ি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা
-
অ্যাসাইলাম প্রত্যাখ্যাত হলেও ৫৫% থাকবেন যুক্তরাজ্যেই, স্বীকার করল হোম অফিস