যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হওয়ার দীর্ঘ চার মাস পর অবশেষে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। শুক্রবার তেহরানে কড়া নিরাপত্তা ও গভীর শোকের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচির সূচনা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা অর্থনৈতিক সংকট ও নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির ভেতরে ধর্মীয় নেতৃত্বের ওপর সাধারণ মানুষের সমর্থন কিছুটা কমে এলেও, এই শেষকৃত্যের মাধ্যমে ইরান বিশ্বকে তাদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও শক্তি প্রদর্শনের বার্তা দিতে চাইছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের ওই হামলায় খামেনির সঙ্গে তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য—মেয়ে, জামাতা, শিশু নাতনি ও পুত্রবধূও নিহত হয়েছিলেন।
শেষবারের মতো প্রিয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানী তেহরানে নেমেছে মানুষের ঢল। ভোর থেকেই হাজারো মানুষ গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সমুখী বিভিন্ন মেট্রো স্টেশন ও সড়কে ভিড় করছেন। ইরানের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় জানাজায় পরিণত হতে যাওয়া এই আয়োজনে আগামী কয়েক দিনে এক থেকে দুই কোটি মানুষের অংশগ্রহণের আশা করছে তেহরান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, অনেক মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথ বন্ধ থাকলেও কালো পোশাক পরিহিত শোকাহত মানুষের দীর্ঘ সারি সেখানে অপেক্ষা করছে। কোথাও কয়েক ডজন, আবার কোথাও শত শত মানুষ স্টেশনের ফটকের সামনে অবস্থান করছেন।
এরই মধ্যে গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সের ভেতর ও বাইরে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর অপেক্ষায় সেখানে অবস্থান করছেন শোকাহত জনতা। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে তেহরানের পরিবেশ হয়ে উঠেছে আবেগঘন ও শোকাবহ।
চলতি বছরের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এবং নতুন করে সৃষ্টি হওয়া আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই বিশাল শেষ বিদায়ের আয়োজনকে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করছে ইরানি প্রশাসন। কফিনগুলো রাখা হয়েছিল একটি খিলানযুক্ত পটভূমির নিচে সাদা রঙের উঁচু বেদির ওপর। এর দুই পাশে জাতীয় পতাকা ও কালো শোক পতাকা উড়ছিল, যা ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় আবহকে একসঙ্গে তুলে ধরেছে।
কফিনের ওপর রাখা হয়েছিল একটি কালো পাগড়ি, যা মহানবী (সা.)-এর বংশধর ধর্মগুরুদের প্রতীক। পাশাপাশি রাখা ছিল একটি ভাঁজ করা চারকোনা চাদর, যা ইরানে বিপ্লবী আদর্শ এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ইরানের তাত্ত্বিক শাসনব্যবস্থায় খামেনি কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই ছিলেন না, বরং নবম শতাব্দীতে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া শিয়া ইসলামের দ্বাদশ ইমামের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হতেন। ফলে শত্রুর হামলায় তার এই মৃত্যুকে শিয়া সম্প্রদায়ের চিরায়ত ‘শাহাদাত’ ও শোকের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। খামেনির মৃত্যুর পর থেকেই শহরের রাস্তায় টানানো কালো পতাকাগুলো মূলত সপ্তম শতাব্দীতে শিয়া ইসলামের তৃতীয় ইমাম ইমাম হোসেনের শাহাদাতের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে।
ইসলামী রীতি অনুযায়ী সাধারণত মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাফন সম্পন্ন করা হলেও, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ সময় পর গত মাসের অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভিত্তিতে এই সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারাও এই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমা হামলায় নিহত ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও দাফনকে ঘিরে সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার প্রথম ধাপ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।
ইরান ও ইরাকের পাঁচটি শহরজুড়ে ছয় দিনব্যাপী এই কর্মসূচিতে এক থেকে দুই কোটি মানুষের অংশগ্রহণের আশা করছে তেহরান। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় জানাজায় রূপ নিতে পারে। এ উপলক্ষে সরকারি কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিক সংগঠন, ত্রাণকর্মী ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, শনি ও রবিবার দুই দিন তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত থাকবে খামেনির মরদেহ। এ সময় সাধারণ মানুষ তাদের প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পাবেন। সোমবার রাজধানীজুড়ে অনুষ্ঠিত হবে বিশাল শোকযাত্রা।
তেহরানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মঙ্গলবার মরদেহ নেওয়া হবে কোম শহরে। এরপর তা ইরাকের বাগদাদ, কারবালা ও নাজাফে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে বিশেষ ধর্মীয় রীতিনীতি ও শোকানুষ্ঠান সম্পন্ন হবে।
১৯৮৯ সাল থেকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা খামেনিকে আগামী বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তার নিজ শহর মাশহাদে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে। এর আগে শুক্রবার গ্র্যান্ড মোসাল্লায় তার মরদেহসহ পাঁচটি কফিন প্রদর্শন করা হয়। নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের মরদেহ সেখানে আনার পর থেকেই সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ভিড় বাড়তে থাকে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি কফিনের মধ্যে রয়েছে আলী খামেনির জামাতা মেসবাহ-উল-হুদা বাঘেরি, বড় মেয়ে সাইয়্যেদেহ বোশরা হোসেইনি খামেনি, পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং মাত্র ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়গানির মরদেহ।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আগামী দুই দিনে অন্তত এক কোটি ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষ খামেনির শেষযাত্রায় অংশ নিতে পারেন। এ কারণে দেশজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ও জরুরি সেবার অংশ হিসেবে তেহরানে মোতায়েন করা হয়েছে ২ হাজার ৫০০টি অ্যাম্বুলেন্স, ২১টি হেলিকপ্টার, ১০০টি ড্রোন এবং হাজারো উদ্ধারকর্মী। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ২০ হাজার শ্রেণিকক্ষ, কয়েক ডজন হাসপাতাল এবং পাঁচ লাখ লিটার স্যালাইন।
এ ছাড়া রাজধানীর বিমানবন্দরগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে এবং ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। শহরজুড়ে ৭০০টির বেশি পার্কিং এলাকা খালি রাখা হয়েছে।
শোকাহত মানুষের খাবারের জন্য ৫ কোটি রুটি তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ কাজে তেহরানজুড়ে মোবাইল বেকারিও মোতায়েন করা হয়েছে।
ইরানের দাবি, ৩০টির বেশি দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি ও প্রতিনিধিদল এবং ৯০টি দেশের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এই আয়োজনে অংশ নেবেন। পাকিস্তান, রাশিয়া ও চীনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি ইতোমধ্যেই নিশ্চিত করা হয়েছে।
-
খামেনির কফিনে লাল পতাকা: প্রতীকী বার্তা কী, শেষ বিদায়ে কেন থাকছেন না মোজতবা খামেনি
-
বাহরাইনকে কঠোর সতর্কবার্তা দিল ইরান: 'নিজেদের সীমা জানো'
-
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতিতে বাংলাদেশিদের জন্য দুঃসংবাদ
-
মেধা শিকারে কানাডা: ১.৭ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড কর্মসূচি ঘোষণা
-
সৌদিতে আপনার ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ? ৩০ জুনই শেষ সুযোগ