৫২বাংলা ডেস্ক | লন্ডন
ইংল্যান্ডে প্রসূতি ও নবজাতক চিকিৎসা সেবার এক ভয়াবহ ও বিপর্যয়কর চিত্র উঠে এসেছে সদ্য প্রকাশিত এক জাতীয় তদন্ত প্রতিবেদনে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই 'অ্যামোস রিভিউ' (Amos Review) স্পষ্ট করেছে যে, দেশটির স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার চরম অবহেলা ও অগ্রহণযোগ্য গাফিলতির কারণে শত শত মায়ের মৃত্যু, নবজাতকের মৃত জন্ম (Stillbirth) এবং গুরুতর শারীরিক পঙ্গুত্বের মতো ঘটনা ঘটছে।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেমস মারে এই প্রতিবেদনটিকে একটি "ঐতিহাসিক মোড়" (Watershed Moment) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি হাসপাতালের কর্মীদের মধ্যকার "বিষাক্ত কর্মপরিবেশ" (Toxic Dynamics) ভেঙে ফেলার এবং প্রসূতি সেবাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য একজন শক্তিশালী 'মেটারনিটি কমিশনার' নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন।
- কেন এই জাতীয় তদন্ত
গত বছরের জুনে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং (Wes Streeting) ইংল্যান্ডের এনএইচএস মেটারনিটি সার্ভিসগুলোর ওপর এই জাতীয় তদন্তের নির্দেশ দেন। লেবার পার্টির পিয়ার ও সাবেক কূটনীতিক লেডি ভ্যালেরি অ্যামোসের নেতৃত্বে গঠিত এই তদন্ত কমিটি মূলত ১২টি নির্দিষ্ট এনএইচএস ট্রাস্টের পাশাপাশি পুরো দেশের প্রসূতি সেবার পদ্ধতিগত ব্যর্থতা ও ত্রুটিগুলো খতিয়ে দেখে।
এর আগে ২০২২ সালে ডোনা ওকেনডেনের (Donna Ockenden) এক তদন্তে দেখা যায়, শ্রুসবারি অ্যান্ড টেলফোর্ড এনএইচএস ট্রাস্টে অবহেলার কারণে ৩০০টি শিশুর মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা মৃত্যু হয়েছে, যা এড়ানো সম্ভব ছিল।
গত সপ্তাহে নটিংহাম ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের ওপর ওকেনডেনের অপর এক প্রতিবেদনে ৫০০-রও বেশি শিশু ও মায়ের মৃত্যু এবং গুরুতর আহতের তথ্য প্রকাশ পায়।
- প্রতিবেদনে উঠে আসা প্রধান তথ্য ও পরিসংখ্যান
মাতৃমৃত্যুর উচ্চ হার: বর্তমানে যুক্তরাজ্যে প্রতি ১,০০,০০০ সন্তান প্রসবে মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় ১২.৮ জন। এটি ২০০৯-১১ সালের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি, অথচ সরকারের লক্ষ্য ছিল এই মৃত্যুর হার অর্ধেকে নামিয়ে আনা। নরওয়ের তুলনায় যুক্তরাজ্যের মায়েদের প্রসবকালীন মৃত্যুর ঝুঁকি তিন গুণ বেশি।
প্রসব-পরবর্তী জটিলতা বৃদ্ধি: ইংল্যান্ডে প্রসব-পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ (Postpartum Haemorrhage)-এর শিকার হওয়া মায়ের অনুপাত ২০২০ সালের প্রতি হাজারে ২৭ জন থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৩২ জনে দাঁড়িয়েছে , যা ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি।
এ ছাড়া প্রসবের সময় মায়েদের থার্ড বা ফোর্থ-ডিগ্রি পেরিনিয়াল টিয়ার (গুরুতর ক্ষত) হওয়ার হার ২০২০ সালের জুনের তুলনায় এ বছর ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি হাজারে ২৯ জনে ঠেকেছে।
সিজারিয়ান ডেলিভারির উল্লম্ফন: গত বছর ইংল্যান্ডের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাভাবিক বা ভেজাইনাল ডেলিভারিকে ছাড়িয়ে গেছে সিজারিয়ান সেকশন (C-Section)। বর্তমানে প্রায় ৪৫ শতাংশ শিশুর জন্ম হচ্ছে সিজারের মাধ্যমে, যার মধ্যে ২৫ শতাংশ হচ্ছে জরুরি বা ইমার্জেন্সি সিজারিয়ান। এই পদ্ধতি স্বাভাবিক প্রসবের চেয়ে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ।
হাসপাতালগুলোর নিম্নমান: 'কেয়ার কোয়ালিটি কমিশন' (CQC)-এর পরিদর্শন অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের ৩৬ শতাংশ মেটারনিটি সার্ভিসের মান উন্নয়নের প্রয়োজন এবং ১২ শতাংশ সার্ভিসকে সম্পূর্ণ 'অপ্রতুল' বা 'ইনঅ্যাডিকোয়েট' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ব্যর্থতার মূল কারণসমূহ
তীব্র কর্মী সংকট: রয়্যাল কলেজ অব মিডওয়াইভসের তথ্যমতে, এনএইচএসে বর্তমানে ২,৫০০ মিডওয়াইফ (দাই/সেবিকা)-এর ঘাটতি রয়েছে। অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রতি তিনজন সদ্য স্নাতকপ্রাপ্ত মিডওয়াইফের মধ্যে একজন চাকরি পাচ্ছেন না।
প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ ও বৈষম্য: প্রসূতি সেবায় জাতিগত ও আর্থসামাজিক বৈষম্য প্রকট। শ্বেতাঙ্গ নারীদের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের সন্তান প্রসবের সময় মারা যাওয়ার ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেশি। একইভাবে, দরিদ্র এলাকার নারীদের মৃত্যুঝুঁকি ধনী এলাকার মায়েদের তুলনায় দ্বিগুণ।
তথ্য গোপন ও অস্বীকারের সংস্কৃতি: লেডি অ্যামোসের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হাসপাতাল ট্রাস্টগুলো প্রায়ই তাদের ভুলত্রুটিগুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে এবং সন্তানহারা ও ট্রমাগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সঠিক জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
তথ্যসূত্র: The Amos Review (২০২৬), Ockenden Maternity Reviews (২০২২ ও ২০২৬), Care Quality Commission (CQC), Royal College of Midwives (RCM), The Guardian, জুন ২০২৬)
৫২বাংলা | 52banglatv.com
-
‘ল্যাম্ব’ কাবাবে ছাগল, চামড়া ও চর্বি : যুক্তরাজ্যের এক প্রতিষ্ঠানের ৫ লাখ পাউন্ড জরিমানা
-
যুক্তরাজ্যে ভ্যাট কমলে বাঁচতে পারে রেস্তোরাঁ-পাব শিল্প, কিন্তু বিল কে দেবে?
-
ইউনিভার্সাল ক্রেডিট যুগে বড় পরিবর্তন: ডিডব্লিউপি নিশ্চিত করল দুই জনপ্রিয় ভাতার সমাপ্তি
-
অবৈধ কর্মী নিয়োগে পূর্ব লন্ডনের ২০ প্রতিষ্ঠানকে লাখ লাখ পাউন্ড জরিমানা
-
যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের বিলাসবহুল ও নতুন বাড়ি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা