যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর ও নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে লেবার সরকার। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো নতুন নির্মিত (New-build) এবং ‘বিলাসবহুল’ (Luxury) হিসেবে বিবেচিত বাড়িতে আশ্রয়প্রার্থীদের রাখা যাবে না। একই সঙ্গে স্কুল, নার্সারি বা শিশুদের জন্য সংবেদনশীল স্থানের কাছাকাছি এলাকায় তাদের আবাসন ব্যবস্থা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের নির্দেশনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Home Office) এবং আবাসন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই নতুন গাইডলাইন বা নির্দেশিকা কার্যকর করা হয়েছে। সরকারের দাবি, স্থানীয় জনগণের উদ্বেগ এবং সামাজিক সংবেদনশীলতার কথা মাথায় রেখেই এই সুসংগঠিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
- স্টোক হিথ প্রকল্প ও মূল বিতর্ক
ইংল্যান্ডের শ্রপশায়ারের স্টোক হিথ (Stoke Heath) গ্রামের একটি নতুন আবাসন প্রকল্পে ২১টি নবনির্মিত বাড়িতে প্রায় ৮০ জন আশ্রয়প্রার্থীকে স্থানান্তরের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়। প্রতিটি বাড়ির বাজারমূল্য প্রায় আড়াই লাখ পাউন্ড ($250,000$)।
ছোট একটি গ্রামীণ এলাকায় বিপুল সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থী এলে স্থানীয় জনসেবা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে বলে অভিযোগ তোলেন বাসিন্দারা। স্থানীয় কনজারভেটিভ এমপি মার্ক প্রিচার্ড এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে একে অবাস্তব বলে আখ্যা দেন। অন্যদিকে, বিরোধী দলের ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলিপ বলেন, নতুন বাড়িতে আশ্রয়প্রার্থীদের রাখার চেয়ে অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর দিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত।
এই বিতর্কের জেরেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, চলতি বছরের শুরুতেই নতুন বাড়ি ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। তবে স্টোক হিথের সিদ্ধান্তটি নতুন নীতিমালা কার্যকর হওয়ার আগেই নেওয়া হয়েছিল।
- হোটেল বন্ধ ও বড় আবাসন কেন্দ্রের ওপর জোর
যুক্তরাজ্য সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত হোটেলের সংখ্যা দ্রুত কমিয়ে আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এর পরিবর্তে সাবেক সামরিক ব্যারাক (Military barracks), পুরোনো শিক্ষার্থী আবাসন এবং বহুবাসিন্দার বাসস্থানের (HMOs) মতো বড় কেন্দ্রগুলো ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
· হোটেল ব্যবহার হ্রাস: গত মার্চ মাস পর্যন্ত ২০,৮৮৫ জন আশ্রয়প্রার্থী হোটেলে ছিলেন, যা আগের তিন মাসের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম। সর্বোচ্চ ৪০০টি হোটেল থেকে কমিয়ে বর্তমানে ব্যবহারের সংখ্যা ১৭০-এ নামিয়ে আনা হয়েছে।
· লক্ষ্য ২০২৯: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগেই আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত সব হোটেল সম্পূর্ণ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
· বিকল্প আবাসন: বর্তমানে প্রায় ৭২,৭৬৮ জন আশ্রয়প্রার্থী বিভিন্ন সরকারি ফ্ল্যাট, বহুবাসিন্দার বাড়ি এবং সাবেক সামরিক ক্যাম্পে অবস্থান করছেন।
আশ্রয় আবেদনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান
সরকারি সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চের শেষে ৪৮,৭৫৮ জন আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন প্রাথমিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিল, যা এক বছর আগের তুলনায় ৫৫ শতাংশ কম এবং ২০১৯ সালের পর সর্বনিম্ন।
তবে বড় সংকট তৈরি হয়েছে আপিল প্রক্রিয়া নিয়ে। বর্তমানে ১ লাখের বেশি প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থী তাদের আবেদন পুনর্বিবেচনার জন্য আপিল করে রেখেছেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে তারা সরকারি অর্থায়নে বিনামূল্যে আবাসনের সুবিধা পাচ্ছেন।
নতুন এই আবাসন নীতিকে কেন্দ্র করে সরকারের কঠোর অভিবাসন অবস্থান এবং স্থানীয় জনগণের উদ্বেগ যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক আরও তীব্র করে তুলেছে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ (The Telegraph)
-
অবৈধ কর্মী নিয়োগে পূর্ব লন্ডনের ২০ প্রতিষ্ঠানকে লাখ লাখ পাউন্ড জরিমানা
-
অ্যাসাইলাম প্রত্যাখ্যাত হলেও ৫৫% থাকবেন যুক্তরাজ্যেই, স্বীকার করল হোম অফিস
-
যুক্তরাজ্যে কেয়ার কর্মীদের জন্য দুঃসংবাদ: স্থায়ী বসবাসের অপেক্ষা বাড়তে পারে ১৫ বছরে
-
যুক্তরাজ্যে স্বামী বা পরিবারের নির্যাতনের শিকার অভিবাসীদের মিলতে পারে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি
-
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার মুহাম্মদ আবদুল মুহিত - পেশাগত পরিচয় কী?
আরও পড়ুন: