ফল নির্ভর ফুটবলে যন্ত্রের কাছে মার খাচ্ছে শিল্প ও কারুকাজ। ব্রাজিলের মতো দল সাম্বার ছন্দ ভুলে আজ ফল তৈরিতে ব্যস্ত।
যেখানে খেলোয়াড়রা আজ ওয়ান টাচে সাফল্যের সূত্র পেতে উদগ্রীব, কোচেরা আচ্ছন্ন - সেখানেই কিছু খেলোয়াড় সবুজ চত্বরে শিল্পের ছোঁয়া, মিউজিকের ছন্দ ও ভুভুজেলার ধ্বনিতে যেন কবিদের মতোই আনমনে ও নিঃশব্দে তৈরি করে চলেছেন ফুটবল কাব্য।
বর্তমানে তাদেরই অগ্রনায়ক হলেন লিওনেল মেসি। ১১০/৭৫ মিটারের আয়তাকার সবুজ মাঠকে শিল্পীর ক্যানভাস বানিয়ে বল পায়ে অবিরাম কবিতা লিখেই যাচ্ছেন এই এলএম টেন।
এক মৌসুমে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৯১ গোল করেছিলেন ,সেটিও এই সিআর সেভেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। আর মেসিই সম্ভবত ইতিহাসের অবিসংবাদিত সেরা ফলস নাইন।
ল্যাটিন ফুটবল এমনিতেই অবিরাম জন্ম দিয়ে গেছে, যাচ্ছে ফুটবল শিল্পীদের। তালিকাটি অগণিত। কতটুকু পথ হাঁটলে তবে পথিক বলা যায় - এই বাক্যের মতোই কতটুকু বা কত দীর্ঘ সময় সবুজ ক্যানভাসে ফুটবল নিয়ে কারিগরি করলে তবেই কিংবদন্তি বলা যায়, সেই প্রশ্নের উত্তর হলেন লিওনেল মেসি।
এখানেই তিনি ফুটবলার হয়ে অবিশ্বাস্য শব্দের প্রতিশব্দ হয়ে গেছেন। কোচদের কাছে নতুন পাঠ্য, প্রতিপক্ষের কাছে আরেকটি সম্মুখ সমর। গোলকিপারদের কাছে দুঃস্বপ্ন, আর ডিফেন্ডারদের কাছে এক আততায়ী এবং নাটমেগের জ্বালা।
মেসি-রোনালদো একই সময়ের দুজন ফুটবলার যাদের ছাড়া ফুটবল ইতিহাস এখন অসম্পূর্ণ। রন যেখানে একজন সৈনিক-জেনারেল কিংবা অ্যাথলেট, মেসি সেখানে শুধুই ফুটবলার।
মেসিকে প্রতিভাবান বলে তাঁর কৃতিত্বের কথা পাশ কাটানোর কোনো সুযোগ নেই, কারণ দিন শেষে প্রতিভাবান কাউকে খোঁজা হয় না - যেমন খোঁজা হয় না মেসির পজিশন।
একজন নিখাদ প্লেমেকার হয়ে যিনি টেক্কা দিচ্ছেন তাবৎ দুনিয়ার স্ট্রাইকারদের। পৃথিবীতে প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে বিস্ফোরণের মাঝেই হয় সার্থকতা । আর মেসি সেখানে এলএম টেনের মতোই দশে দশ।
স্কোরিং, অ্যাসিস্ট, প্লেমেকিং, ড্রিবলিং, অফ অ্যান্ড অন দ্য মুভমেন্ট উইথ বল, গেম বিল্ডিং, অ্যাকুরেসি -ইদানীং ফ্রি কিক কিংবা ডেড বল স্পেশালিস্ট হিসেবে যেভাবে দলের প্রাণভোমরা কিংবা নিউক্লিয়াস হয়ে খেলে যাচ্ছেন অবিতর্কিতভাবে, সেখানে জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে উঠেছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফুটবলপ্রেমীদের জন্য লিডিং ফ্রম দ্য ফ্রন্ট আইডল হিসেবে।
এখানেই সার্থকতা- যে বিশ্বে আছে ফুটবলপ্রেম, সে বিশ্বের সব শিশুই হতে চায় মেসি। নানা বিশেষণে আর বিশেষজ্ঞদের উপমাবর্ষণে অনেক আগেই ভিজে গেছেন এই ম্যাজিশিয়ান। বয়স একটি সংখ্যা মাত্র- এই নিয়মেই হয়তো খেলে যাচ্ছেন একই গতি, স্কিল আর ডিফেন্স ভাঙার মত্ত আয়োজনে।
স্যালুট হে ফুটবল যাদুকর -যার কল্যাণে ফুটবল মাঠে রচিত হয় ছন্দময় কবিতা, তৈরি হয় মেক্সিকান ওয়েভ, মাথা ঠান্ডা করা পাসে তৈরি হয় আরেকটি সাফল্যগাথা, ড্রিবলিংয়ে ঝরে পড়ে প্রতিপক্ষের ক্যাকটাসের মতো বাধাগুলো, প্রতিপক্ষকে অতিক্রম করার পরে তারাই উপভোগ করতে শুরু করে বাকিটুকু -আর এভাবেই মেসি হয়ে উঠেছেন অবিশ্বাস্য শব্দের অর্থ কিংবা প্রতিশব্দ -মেসি, মেসি, মেসি।
ফুটবলে পূর্ণতা পাওয়ার জন্য স্কিল আর পারফরম্যান্সই যেখানে প্রধান বিচার্য, সেখানে পরিসংখ্যানবিদরা একটি তালিকা ধরিয়ে দেন। সেই তালিকার প্রথম বাক্য -বিশ্বকাপ। ২০২২ সালে আরবের মরুঝড়ে গিয়ে তৃষ্ণার্ত পরিসংখ্যানবিদদের হাতে বিশ্বকাপটাও ধরিয়ে দিয়ে সেই চ্যাপ্টারটা ক্লোজ করে দেন।
এরপর থেকে আসলে ফুটবলের পূর্ণতার গল্প যেটা, সেটার নামই লিওনেল মেসি।
কিন্তু পরিসংখ্যানবিদদের তৃষ্ণার্ত গলা বিশ্বকাপ দিয়ে ভিজিয়ে দিলেই বা কী হবে -মেসির তৃষ্ণা তো এখনো মেটেনি বলেই ২০২৬-এর বিশ্বকাপে তিনি হাজির।
কোচের ট্যাকটিক্স, প্রতিপক্ষের অসংখ্য ছক, ক্যাকটাসের মতো ডিফেন্স, মেসিকে ঘিরে ধরা অক্টোপাসের মতো অসংখ্য হাত-পা -সবকিছুকে অতিক্রম করে এই বিশ্বকাপেও এখন পর্যন্ত তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতা। প্রশ্ন হলো, এত সব প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পরও সেই গোলটি কিন্তু এখনো মেসিই বেশি করেন।
মেসি কেন পৃথিবীর ইতিহাসের সকল নম্বর নাইনদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে করতে এখন এসে ইয়ামাল, হালান্ড, এমবাপ্পেদের সঙ্গেও প্রতিযোগী হতে হচ্ছে?
সেটা আসলে মেসির সমস্যা নয় -সমস্যা হচ্ছে মেসি তাঁর স্বাভাবিক যে লেভেল তৈরি করেছেন, সেখানে দুই ম্যাচ গোল না করলেই গোলখরা বলা হচ্ছে। সেই মেসি গোল করছেন - তাঁর সঙ্গের সিনিয়র-জুনিয়র প্রতিযোগীরা সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে হিমশিম খাচ্ছেন। এখানেই এলএম টেন হয়ে যাচ্ছেন ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় এলএম নাইন।
এই বিশ্বকাপে মেসির গোল মেকিং এবং প্লেমেকিংয়ের সঙ্গে যেটি যুক্ত হয়েছে সেটি হচ্ছে গোল স্কোরিং- যেটা মূলত নম্বর নাইনের কাজ। তো নম্বর টেন জার্সি পরে কেউ যখন নম্বর নাইনের কাজটি করে দেয় এবং সেটা এমনভাবে করে যে বিশ্বকাপের ৪৮টি দলের সকল নম্বর নাইনদের চেয়েও বেশি -এরপর সম্ভবত পরিসংখ্যানবিদদের নম্বর নাইন নিয়ে আর গবেষণা করতে হবে না।
ফুটবল ছাড়া আড্ডাতেও এজন্য একে অন্যের ক্যারিশমার কাছে পরাস্ত হলে অবলীলায় মুখ ফুটে বলে ওঠে
"তুই তো দেখি একটা মেসি…"
দ্যাটস দ্য পয়েন্ট।
সবুজ মাঠে পা নামক তুলি দিয়ে যেভাবে পিকাসোর হাত হয়ে ওঠেন লিওনেল মেসি- সে জন্য এখন তাঁকে ফুটবলার বলার চেয়ে সহজ উচ্চারণ হয়তো ফুটবল শিল্পী… যাঁর ক্যানভাসে সবুজ চত্বরে ছন্দের মূর্ছনা তুলে দাগ কেটে যাওয়া।
ফুজেল আহমদ: লেখক, ক্রীড়া বিশ্লেষক । টরেন্টো, কানাডা। ৩ জুলাই ২০২৬
-
ইয়ামালকে থামাতে সতর্ক রাংনিক, স্পেনের বিপক্ষে অস্ট্রিয়ার বিশেষ পরিকল্পনা
-
নেইমারকে না নামানোর কারণ জানালেন ব্রাজিল কোচ, কৌশলে জাপান-বাধা পেরুলেন
-
মাথা নত করে সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চাইলেন জাপানের কোচ মরিয়াসু
-
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন হ্যারি কেইন
-
পানামাকে হারিয়ে গ্রুপ সেরা ইংল্যান্ড, রানার্সআপ ক্রোয়েশিয়া
আরও পড়ুন: