বাড়ি দখলের পুরোনো ঘটনা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল, নিজেই সত্যতা জানালেন প্রবীণ অভিনেত্রী ।৫২বাংলা বিশেষ প্রতিবেদন
দেশের বরেণ্য অভিনেত্রী দিলারা জামানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ফটোকার্ড নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ। ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, বাবার দেওয়া জমিতে ধারদেনা করে বাড়ি করেছিলেন তিনি, ভাড়াটিয়া বাড়িভাড়ার টাকা না দিয়ে এক পর্যায়ে বাড়িটিই দখল করে নেয়, আর বর্তমানে তিনি ছোট্ট একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। এমন তথ্য গত শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
তবে বিষয়টি জানার পর বিস্মিত ও বিরক্ত হয়েছেন দিলারা জামান নিজেই। কারণ, ছড়িয়ে পড়া ঘটনার হালনাগাদ কোনো সত্যতা নেই বলে তিনি স্পষ্ট করেছেন।
- আসল ঘটনা কী ছিল
দিলারা জামান জানান, বাড়ি দখলের ঘটনাটি সত্যি ঘটেছিল, তবে তা বর্তমান সময়ের নয়-প্রায় ২২ থেকে ২৩ বছর আগের। তিনি বলেন, ২০০৩-২০০৪ সালের দিকে ঢাকার শ্যামলী এলাকায় বাবার দেওয়া জমিতে গড়া পৈতৃক বাড়িতে পরিবারসহ থাকতেন তিনি।
সে সময় বাড়িটি নিয়ে দখলের একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে তখন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্টদের টনক নড়ে এবং দখলের প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।তবে সেই বাড়ি এখন আর তাঁর মালিকানায় নেই-পরবর্তীতে তিনি নিজেই বাড়িটি বিক্রি করে দেন। ২০০৮ সালে পরিবার নিয়ে উত্তরায় চলে আসেন এবং সেখানে ১৬০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কেনেন।
তখন থেকে নিজের কেনা সেই ফ্ল্যাটেই বসবাস করছেন তিনি, কোনো ভাড়া বাসায় নয়। মাঝেমধ্যে বিদেশে থাকা দুই মেয়ের কাছে কিছুদিনের জন্য যান, তবে এখন আর তেমন বিদেশ যাওয়া হয় না বলেও জানান তিনি।
- নিজের প্রতিক্রিয়ায় দিলারা জামান
পুরোনো ঘটনা নতুন করে বিকৃতভাবে ছড়ানো নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে দিলারা জামান বলেন, "মানুষের মাথা কি নষ্ট হয়ে গেছে! একটু ভেবেচিন্তে, কথা বলে লিখলে তো ভালো হয়। ভালো কাজে যদি মস্তিষ্ক কাজে না লাগে, তাহলে কেমন লাগে! কী আর বলব!" তিনি প্রশ্ন তোলেন, এতদিন পর পুরোনো এই ঘটনা কেন বা কারা নতুন করে ছড়াল, এবং এমন আজগুবি তথ্য কীভাবে সামনে এলো, তা নিয়ে নিজেও অবাক হয়েছেন বলে জানান।
- কীভাবে ছড়াল গুজব
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফটোকার্ডের বক্তব্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত শুক্রবার সকাল থেকেই আলোচনা শুরু হয়। এরপর একাধিক জাতীয় গণমাধ্যম-যেমন প্রথম আলো, দেশ রূপান্তর, কালবেলাসহ কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল দিলারা জামানের বক্তব্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে, যেখানে অভিনেত্রী নিজে বিষয়টি স্পষ্ট করেন এবং জানান, বাড়ি দখলের ঘটনা সত্য হলেও তা বহু বছর আগের, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে ফটোকার্ডটি সর্বপ্রথম ঠিক কোন পেজ বা অ্যাকাউন্ট থেকে তৈরি বা প্রকাশ করা হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিষয়টি মূলত ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে ফটোকার্ড আকারে ছড়াতে শুরু করে, যেখানে পুরোনো একটি প্রকৃত ঘটনাকে বর্তমান সময়ের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করে বিভ্রান্তিকর তথ্য যুক্ত করা হয়-বিশেষ করে "ভাড়া বাসায় থাকা" ও "আর্থিক দুরাবস্থার" মতো অসত্য দাবি।
- পুরোনো সত্য ঘটনা যেভাবে বিকৃত হলো
এই ঘটনা একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যেখানে দুই দশকেরও বেশি আগের একটি প্রকৃত ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাকে প্রেক্ষাপটবিহীনভাবে তুলে এনে বর্তমান সময়ের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মূল ঘটনায় সমস্যার সমাধানও হয়ে গিয়েছিল-দিলারা জামান বাড়িটি নিজের মালিকানায় রেখেই পরে বিক্রি করেছিলেন এবং আর্থিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যেই আছেন। কিন্তু ফটোকার্ডে যুক্ত করা "ভাড়াটে বাড়ি দখল করে নেয়" ও "ছোট্ট পাখির মতো বাসায় ভাড়া থাকি"-জাতীয় বাক্য প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
দিলারা জামানের এই ঘটনা প্রমাণ করে, সময় ও প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করে পুরোনো তথ্য কীভাবে নতুন মোড়কে ভুল বার্তা ছড়াতে পারে, এবং যাচাই ছাড়া তথ্য শেয়ার করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে-বিশেষত প্রবীণ ও অসুস্থ শিল্পীদের ক্ষেত্রে, যেখানে ভুল তথ্য তাদের সম্পর্কে অহেতুক উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ৫২বাংলার বিশেষ রিপোর্ট (প্রথম আলো, দেশ রূপান্তর, কালবেলা ও অন্যান্য গণমাধ্যম)।