কারাগার মানেই শুধু চার দেয়ালের মধ্যে বন্দিত্ব ও সাজা ভোগ-এই প্রচলিত ধারণা বদলে বাংলাদেশে কারা ব্যবস্থাপনাকে ধীরে ধীরে আরও মানবিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও সংশোধন-পুনর্বাসনমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্দিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মদক্ষ করে তোলা এবং মুক্তির পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরিতে একাধিক কর্মসূচি চালু হয়েছে। তবে মাদক প্রবেশ, দুর্নীতি, খাদ্য বণ্টনে বৈষম্য ও বন্দিদের নিরাপত্তার মতো দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলোর সমাধানে অগ্রগতি এখনও সীমিত বলে সমালোচকদের মত।
ভিডিও কলে স্বজনের মুখ দেখার সুযোগ
কারাবন্দিদের স্বজনদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার সুবিধা চালু করা হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য কারাগারেও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে এই ব্যবস্থা চালুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নির্ধারিত নিয়ম মেনে বন্দিরা সীমিত সময়ের জন্য পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে পারবেন, যেখানে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এর আগে বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ ছিল মূলত টেলিফোনভিত্তিক-ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাই করে সাত দিনে একবার সর্বোচ্চ ১০ মিনিট কথা বলার সুযোগ ছিল। দূরবর্তী জেলার পরিবারগুলোর জন্য সরাসরি সাক্ষাৎ করতে যাতায়াত, থাকা-খাওয়াসহ জনপ্রতি গড়ে প্রায় ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতো বলে আগের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল। ভিডিও কল চালু হলে কণ্ঠের বদলে মুখোমুখি দেখার সুযোগ তৈরি হবে, যা বিশেষ করে শিশু সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে কার্যকর হতে পারে বলে কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য।
প্রশিক্ষণ ও উৎপাদনে যুক্ত বন্দিরা
কারা অধিদপ্তরের উদ্যোগে বন্দিদের পোশাক তৈরি, সেলাই, সাবান উৎপাদন, বেকারি, প্রিন্টিং, ইলেকট্রনিকস ও আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ ও মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার-৩-এ এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। বন্দিদের তৈরি পণ্য 'কারা পণ্য' নামে ব্র্যান্ডিং করে বিক্রি করা হচ্ছে, যার লভ্যাংশের একটি অংশ বন্দিদের দেওয়া হয়।
কারা অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৭৩টি কারাগারে বন্দিদের তৈরি পণ্য প্রায় ৫ কোটি ৬৪ লাখ ৬৯ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, আর এই সময়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ৮ লাখ ১৩ হাজার ৮৮৮ জন বন্দিকে পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৮১ লাখ ৪২ হাজার টাকা। কাশিমপুর মহিলা কারাগারে চালু হয়েছে 'প্রিজনার ক্যাশ' ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বন্দিরা উপার্জিত অর্থ দিয়ে ক্যানটিন থেকে কেনাকাটা করতে বা নির্দিষ্ট নিয়মে পরিবারের কাছে অর্থ পাঠাতে পারেন।
খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ উন্নয়নে উদ্যোগ
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রুটি তৈরির কাজ দ্রুত ও স্বাস্থ্যসম্মত করতে চীন থেকে আমদানি করা মেশিন বসানো হয়েছে। বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগের সুপারিশ পাওয়া গেছে। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ মিনারেল ড্রিংকিং ওয়াটার প্ল্যান্ট চালু হয়েছে, আর সিলেট-১, কিশোরগঞ্জ-১ ও খুলনা নতুন কারাগারে প্রায় ১৮ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে।
মাদক ও দুর্নীতির পুরোনো অভিযোগ এখনও অমীমাংসিত
তবে এসব সংস্কার উদ্যোগের পাশাপাশি কারাগার ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের কিছু অভিযোগে কার্যকর অগ্রগতি এখনও সীমিত বলে সমালোচকদের মত। কারাগারে মাদক প্রবেশ ঠেকাতে 'জিরো টলারেন্স' নীতি ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে এই সমস্যা এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মাদক সরবরাহের অভিযোগে এক কারারক্ষীর বিরুদ্ধে নয়টি বিভাগীয় মামলা হওয়ার পরও তাকে দায়িত্ব থেকে সরানো ছাড়া বড় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যা কারা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
কারাগারে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও নতুন নয়। এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এক সাবেক ডিআইজির বিরুদ্ধে বন্দী বেচাকেনা, সুস্থ বন্দীদের অর্থের বিনিময়ে হাসপাতালে ভর্তি করানো এবং সাক্ষাৎ ও জামিন-বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া যায়, আর তদন্তে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ মেলে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এসব অনিয়ম একটি সংঘবদ্ধ স্বার্থান্বেষী চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয় বলে ধারণা করা হয়।
বন্দিদের খাদ্য বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগও দীর্ঘদিনের-ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী বন্দিদের জন্য আলাদা মানের খাবার আর সাধারণ বন্দিদের জন্য নিম্নমানের খাবার সরবরাহের অভিযোগ মাঝেমধ্যেই গণমাধ্যমে উঠে আসে। একইভাবে নারী ও পুরুষ বন্দিদের যৌন নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত-বিশেষ করে ক্ষমতার অপব্যবহার, হয়রানি ও সুরক্ষাহীনতার অভিযোগ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে।
সংস্কারের সফলতা নির্ভর করছে কাঠামোগত সমস্যা সমাধানে
কারা কর্তৃপক্ষ ভিডিও কল, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশ উন্নয়নের মতো উদ্যোগগুলোকে সংস্কারের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে। কারা মহাপরিদর্শকের বক্তব্য অনুযায়ী, বন্দিদের সময়কে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য দক্ষ করে তোলাই কারা ব্যবস্থাপনার অন্যতম লক্ষ্য। কারা অধিদপ্তরের পরিকল্পনায় রয়েছে উৎপাদনমুখী কার্যক্রম সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন।
তবে সমালোচকদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন, খাদ্য বণ্টনে সমতা ও বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো মৌলিক সমস্যাগুলোতে টেকসই অগ্রগতি ছাড়া 'কারাগার থেকে সংশোধনাগার'-এ রূপান্তরের এই প্রচেষ্টা পূর্ণাঙ্গ সফলতা পাবে না। ফলে সামগ্রিক সংস্কার কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এসব দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা সমাধানে সরকার ও কারা কর্তৃপক্ষ কতটা আন্তরিক ও স্বচ্ছভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে, তার ওপর।
সূত্র: কারা অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিবেদন
-
মন্ত্রী এলেই দৃশ্য বদলায় ওসমানী হাসপাতাল, বছরজুড়ে কেন ভোগান্তি: প্রশ্ন রোগীদের
-
মালয়েশিয়ার মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসার সুবিধা বাংলাদেশিদের জন্য সীমিত হলো
-
দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেলেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ইয়াসমিন
-
ঢাকায় গ্রেপ্তার বিয়ানীবাজার আওয়ামী লীগ নেতা পল্লব, নেওয়া হচ্ছে সিলেট আদালতে
-
৬ মাসের মধ্যে ২ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক নেবে মালয়েশিয়া