ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইরানে তৈরি ‘শাহেদ–১৩৬’ ড্রোন ব্যবহার করে আসছে। এবার সেই ড্রোনই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যবহার করছে ইরান। প্রায় ৫০ হাজার ডলার মূল্যের এই ড্রোনগুলো ইঞ্জিনের কর্কশ শব্দের কারণে সহজেই আলাদা করে চেনা যায়।
গত ৪৮ ঘণ্টায় বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কয়েক শ শাহেদ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি ও ভীতি প্রদর্শনের কৌশল হিসেবে তেহরান এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
বাহরাইন থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রাতের আঁধারে ডেল্টা-উইং আকৃতির একটি ড্রোন লনমাওয়ারের মতো শব্দ তুলে একটি বহুতল ভবনের দিকে ছুটে গিয়ে সজোরে আঘাত হানে। এতে ব্যালকনি দিয়ে জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ পড়ে যেতে দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, অ্যাপার্টমেন্টটি সরাসরি আঘাত থেকে রক্ষা পায়নি।
গত শনিবার সকালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের লক্ষ্য করে এক হাজারের বেশি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। এর একটি বড় অংশই শাহেদ–১৩৬ মডেলের বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সোমবার বিকেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, তাদের লক্ষ্য করে ৬৮৯টি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪৫টি ভূপাতিত করা সম্ভব হলেও ৪৪টি ড্রোন (মোটের ৬ শতাংশের বেশি) লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
যেভাবে কাজ করে শাহেদ–১৩৬
শাহেদ–১৩৬ ড্রোনের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৫ মিটার এবং ডানার বিস্তার ২ দশমিক ৫ মিটার। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটি সস্তা এবং সহজে উৎপাদনযোগ্য। হামলার আগে ইরান বছরে কয়েক ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারত। ফলে চলমান সংঘাতে কিছু সময় এসব ড্রোন বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিটি ড্রোন প্রায় ৫০ কেজি বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম। এটি আকাশচুম্বী ভবন ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যথেষ্ট হলেও সম্পূর্ণ ধসিয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী নয়।
ড্রোনগুলো তুলনামূলক ধীরগতির হলেও বড় আকার, উচ্চ শব্দ এবং লক্ষ্যবস্তুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার কৌশল সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। ইউক্রেনে এর দ্রুতগতির জেট ইঞ্জিন সংস্করণও দেখা গেছে।
বাহরাইন থেকে পাওয়া আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দপ্তরের ওপর দিয়ে একটি ডেল্টা-উইং ড্রোন উড়ে গিয়ে একটি রাডার ডোমে আঘাত হানে এবং সেটি ধ্বংস করে।
কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও এ ধরনের হামলার খবর মিলেছে। সাইপ্রাসের আক্রোতিরিতে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর (আরএএফ) একটি ঘাঁটিতেও সম্ভবত একই ধরনের ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
এই ড্রোনের পাল্লা সর্বোচ্চ প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার। পূর্বনির্ধারিত জটিল রুট ধরে উড়তে পারে এবং রাডার এড়াতে নিচু দিয়ে চলে। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দূর থেকে অপারেটরের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের সুযোগও রয়েছে, ফলে শেষ মুহূর্তে দিক পরিবর্তন সম্ভব।
নকশা, উৎপাদন ও বিস্তার
শাহেদ–১৩৬ গত দশকের শেষ দিকে ইরানে নকশা করা হয়। ২০২১ সালের জুলাইয়ে ইসরায়েলি মালিকানাধীন তেলবাহী জাহাজ ‘মার্সার স্ট্রিট’-এ হামলার পর এ ড্রোনের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। ওই ঘটনায় একজন ব্রিটিশ ও একজন রোমানীয় নাগরিক নিহত হন।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় হামলায়ও সম্ভবত এই ড্রোন ব্যবহৃত হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের ‘শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ রিসার্চ সেন্টার’—যা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অধীন—এই ড্রোনের নকশা করে। ২০২২ সালের শরৎকাল থেকে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যাপক ব্যবহারের ফলে ড্রোনটি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়।
শুরুতে ইরান থেকে রপ্তানি হলেও পরে প্রযুক্তি রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে রাশিয়ার ভোলগা নদীর তীরবর্তী ইয়েলাবুগা শহরের একটি কারখানায় বিপুল পরিমাণে এ ড্রোন তৈরি হচ্ছে।
রাশিয়া ইউক্রেনে হামলার সময় প্রায় ৮০০টি শাহেদ–১৩৬, ‘জেবেরা’ ডেকয় ড্রোন এবং অল্পসংখ্যক ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করে থাকে। মূল লক্ষ্য থাকে আকাশ প্রতিরক্ষা বিভ্রান্ত করা, যাতে ড্রোনের আড়ালে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সফলভাবে আঘাত হানতে পারে।
তবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক হামলাগুলোর ভিডিওতে দেখা গেছে, বিশাল ঝাঁকের বদলে বিচ্ছিন্নভাবে ড্রোন আঘাত হানছে।
ইউক্রেনে এই ড্রোন বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানতে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এতে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে এবং লাখো ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরান একই কৌশল নিলে সফল হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। সোমবার সকালে সৌদি আরবের বৃহত্তম শোধনাগার রাস তানুরায় ড্রোন হামলার পর অগ্নিকাণ্ড ঘটে এবং শোধনাগারটি বন্ধ রাখতে হয়। যদিও হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি শাহেদ ড্রোন কি না নিশ্চিত নয়, তবে ধ্বংসক্ষমতা ছিল একই ধরনের।