ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর প্রায় তিন মাস পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে এখন একটি বড় প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে—তিনি কি শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন?
বিশ্লেষকদের মতে, পৃথক সামরিক অভিযানে কিছু সফলতা পেলেও সামগ্রিকভাবে ভূরাজনৈতিক ফলাফল ট্রাম্পের প্রত্যাশা অনুযায়ী যাচ্ছে না। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ, পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দিতে অনীহা এবং ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অর্জন কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
‘পূর্ণাঙ্গ জয়’ দাবি নিয়ে প্রশ্ন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবার ‘পূর্ণাঙ্গ জয়’ অর্জনের দাবি করলেও বিশ্লেষকরা এটিকে ‘ফাঁকা আওয়াজ’ হিসেবে দেখছেন। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা, পাল্টাপাল্টি হুমকি এবং সামরিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব দিতে ইরান যে সক্ষম, তা ফেব্রুয়ারির শেষ দিকের পরবর্তী ৪০ দিনের ঘটনাপ্রবাহেই স্পষ্ট হয়েছে।
যুদ্ধের ফল উল্টো হতে পারে
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কৌশলগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে, সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পরও ইরান বৈশ্বিক তেল-গ্যাস সরবরাহে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা দেখিয়ে তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে উঠে আসতে পারে।
বিশ্লেষকদের ভিন্নমত
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এখনো আলোচনার মাধ্যমে ট্রাম্প পরিস্থিতি নিজের পক্ষে নিতে পারেন। তবে অন্যরা তার যুদ্ধ-পরবর্তী ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
“তিন মাস চলছে, ট্রাম্প স্বল্প সময়ে হেসেখেলে জিতবেন এমন ছকে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল তা এখন দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত হতে চলেছে বলেই মনে হচ্ছে,” — বলেন অ্যারন ডেভিড মিলার।
‘লুজার’ হতে চান না ট্রাম্প
নিজেকে ‘লুজার’ হিসেবে দেখতে নারাজ ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাবমূর্তি এড়াতেই তিনি সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি থেকে সরে আসতে চাইবেন না এবং ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির মতো কোনো সমঝোতায় ফিরতেও অনীহা দেখাবেন।
তবে হোয়াইট হাউস এসব বিশ্লেষণ প্রত্যাখ্যান করেছে। মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন,
“প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে সব কার্ড রয়েছে, তিনি বুদ্ধিমানের মতো সব বিকল্প খোলা রেখেছেন,”।
অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে
নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও ট্রাম্প এখন এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন, যা তার পররাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
দেশের ভেতরেও এর প্রভাব পড়ছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং জনঅসন্তোষ বাড়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে ট্রাম্পের দল।
সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা—
একটি হলো তুলনামূলক দুর্বল একটি চুক্তি মেনে নেওয়া, অন্যটি হলো সামরিক পদক্ষেপ বাড়িয়ে সংঘাত দীর্ঘায়িত করা।
কূটনীতি ব্যর্থ হলে সীমিত হামলা চালিয়ে সেটিকে ‘চূড়ান্ত বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা।
লক্ষ্য অর্জন এখনো অনিশ্চিত
যুদ্ধে যাওয়ার সময় ট্রাম্প তিনটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন—
- ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা
- আঞ্চলিক হুমকি কমানো
- ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা
বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত এসব লক্ষ্য অর্জনের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ নেই।
ইরানের অবস্থান শক্ত
বিশ্লেষক জনাথন পেইনকফের মতে, ব্যাপক ক্ষতির পরও শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বজায় রাখা ইরানের জন্য একটি বড় অর্জন।
ইরান বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত করতে চায়।
যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাব
এই সংঘাতের কারণে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা বিশ্লেষণ করছে বলেও ধারণা বিশ্লেষকদের।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের রবার্ট কেইগান মনে করেন, ইরানে পরাজয় যুক্তরাষ্ট্রকে ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের চেয়েও বেশি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।
সময় বাড়ছে, অনিশ্চয়তাও
ট্রাম্প শুরুতে এই অভিযানের মেয়াদ ছয় সপ্তাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে ধারণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তা দ্বাদশ সপ্তাহে গড়িয়েছে। যদিও তার সমর্থকগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনও তার পাশে রয়েছে, তবুও রিপাবলিকানদের মধ্যেই ভিন্নমত বাড়ছে।
আরও পড়ুন: