দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছেই প্রাণ হারিয়েছে চট্টগ্রামের পটিয়ার তরুণ মো. ফাহাদ (১৮)। চলতি বছর তাঁর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উন্নত জীবনের স্বপ্নে দালালের মাধ্যমে তাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠান বাবা নুর মোহাম্মদ। ইথিওপিয়া থেকে প্রায় ১৫ দিন দুর্গম জঙ্গলপথে যাত্রা শেষে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত সেখানেই মৃত্যু হয় তাঁর।
হাসিখুশি স্বভাবের ফাহাদ ছোটবেলা থেকেই বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতেন। তাঁর দুই মামা দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যবসা করে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হয়েছেন। তাঁদের মতো সফল হওয়ার আশায় তিনিও সেখানে যেতে চেয়েছিলেন। ছেলের ইচ্ছা পূরণে ৯ লাখ টাকা ব্যয় করে দালালের মাধ্যমে তাঁকে পাঠান বাবা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই ঝরে গেল তাঁর জীবন।
৩০ জানুয়ারি ঢাকা থেকে বিমানে রওনা দেন ফাহাদ। পরিকল্পনা ছিল—প্রথমে ইথিওপিয়া, সেখান থেকে আরেকটি ফ্লাইটে জিম্বাবুয়ে হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে বাস্তবে তা হয়নি। ইথিওপিয়া থেকে দালালরা তাঁকে জঙ্গলপথে জিম্বাবুয়ে নিয়ে যায়। সেখান থেকে সড়কপথে ১৫ ফেব্রুয়ারি রোববার দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছান তিনি। সকালে পৌঁছানোর খবর পেলেও, একই রাতেই ফোনে আসে মৃত্যুসংবাদ।
ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন নুর মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘আমি ছেলেকে কখনো কোনো অভাব দেখাইনি। বলতাম, বাবা তুই পড়ালেখা কর। কিন্তু সে দক্ষিণ আফ্রিকা যেতে চাইত। এরপর ব্যবস্থা করে দিই। এখন আমার ফাহাদ আর নেই।’
নুর মোহাম্মদ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার জোয়ারা ইউনিয়নের উত্তর জোয়ারা গ্রামের বাসিন্দা। দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে ফাহাদ ছিলেন মেজ। তিনি স্থানীয় কাঞ্চনাবাদ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। এ বছর তাঁর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন।
একটি বেসরকারি বিমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নুর মোহাম্মদ জানান, ফাহাদের বড় মামা প্রায় ১০ বছর আগে এবং ছোট মামা ৮ মাস আগে একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় গেছেন। ছেলের অনুরোধে বিভিন্নজনের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে দালালের মাধ্যমে তাঁর যাত্রার ব্যবস্থা করেন তিনি।
নুর মোহাম্মদ বলেন, ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনে বলা হয়, ‘আপনার ছেলে ফাহাদ আর নেই, ইন্না লিল্লাহ পড়েন, সে মারা গেছে।’
পরিবারের ধারণা, দীর্ঘ ও কষ্টকর পথযাত্রা, অনাহার, অসুস্থতা এবং চিকিৎসাসেবার অভাবেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। সঙ্গে ২০০ ডলার ও শুকনা খাবার দেওয়া হলেও জঙ্গলপথে সব ছিনতাই হয়েছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন।
নুর মোহাম্মদ জানান, শুরুতে দুই লাখ টাকা দেন দালাল চক্রকে। যাত্রার সময় ব্যাংক হিসাব নম্বরে আরও সাত লাখ টাকা পাঠানো হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছানোর পর দেড় লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। মৃত্যুর পর দালালরা টাকা ফেরতের আশ্বাস দিয়েছে।
১৫ ফেব্রুয়ারি সকালে দক্ষিণ আফ্রিকার মুসিনা শহরে পৌঁছানোর খবর দিয়েছিলেন ফাহাদের ছোট মামা মোহাম্মদ ফয়সাল। একটি কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছেন—এই খবর শুনে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন পরিবার। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। রাতে পাসপোর্টে থাকা ঠিকানা দেখে একজন ফোন করে মৃত্যুসংবাদ জানান।
শোকে স্তব্ধ নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘ছেলেকে অন্তত শেষবারের মতো দেখতে চাই। কীভাবে ওকে ছাড়া থাকব? এত হাসিখুশি ছেলেটার জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল।’