কাঁঠালের জন্য বিখ্যাত গাজীপুরে প্রতি বছর মৌসুমে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত হলেও সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় উৎপাদিত ফলের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। ভরা মৌসুমে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে দামও কমে যায়, ফলে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন এবং অপচয় হয় জাতীয় ফলটির। এই চিত্র বদলানোর সম্ভাবনা দেখাচ্ছেন গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার বৈরাগীরচালা গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া। কাঁঠাল দিয়ে বিস্কুট তৈরি করে তিনি দেখিয়েছেন, মৌসুমি এই ফলকে প্রক্রিয়াজাত করে সারা বছরই বাজারজাত করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে বিস্কুট তৈরি
শ্রীপুরে তাঁর প্রতিষ্ঠান মেহমান ফুড-এ স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে তৈরি হচ্ছে কাঁঠালের বিস্কুট। কাঁঠালের রসের সঙ্গে ঘি, বাটার, দুধ, ময়দাসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এই বিস্কুট। উদ্যোক্তার দাবি, এতে কোনো কৃত্রিম ফ্লেভার বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। ইতোমধ্যে অনলাইন বাজারে পণ্যটির চাহিদা তৈরি হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিনই নতুন অর্ডার আসছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, শ্রীপুর উপজেলায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে কাঁঠাল চাষ হয়। উঁচু লাল মাটির কারণে শ্রীপুরের কাঁঠাল স্বাদ, গন্ধ ও মানের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
কারখানার প্রধান কারিগর মানিক মিয়া জানান, পাকা কাঁঠালের কোষ প্রথমে ব্লেন্ড করা হয়। এরপর এর সঙ্গে ঘি, বাটার, দুধ, ময়দা ও অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয় ম-। পরে ডাইসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট আকৃতি দিয়ে ওভেনে বেক করা হয়। প্রতিটি বক্সে ৮৫০ গ্রাম বিস্কুট প্যাকেটজাত করে সরবরাহ করা হচ্ছে।
বাড়ছে অর্ডার, বাড়ছে চাহিদা
স্টেডফাস্ট কুরিয়ারের কর্মী রাকিব জানান, গত কিছুদিন ধরে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাঁঠালের বিস্কুট পাঠানো হচ্ছে। যারা একবার কিনছেন, তাঁদের অনেকেই আবার অর্ডার করছেন, এবং দিন দিন অর্ডারের সংখ্যাও বাড়ছে।
উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া জানান, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ কেজি কাঁঠালের বিস্কুট বিক্রি হচ্ছে। বিদেশ সফরের সময় বিভিন্ন দেশে স্থানীয় ফল ও কৃষিপণ্য দিয়ে তৈরি খাদ্যপণ্য দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন। বিশেষ করে চীনসহ কয়েকটি দেশে কাঁঠালভিত্তিক খাদ্যপণ্য দেখে দেশে ফিরে তিনি এ বিষয়ে নিজে গবেষণা শুরু করেন।
তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেখেছি, তারা নিজেদের স্থানীয় ফল-ফসল থেকে নানা ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরি করছে। আমাদের এলাকায় কাঁঠালের রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন হয়, কিন্তু সংরক্ষণের উদ্যোগ কম থাকায় মৌসুমে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল নষ্ট হয়। বিদেশে দেখা প্রযুক্তি ও পরামর্শ কাজে লাগিয়ে নিজেই কাঁঠালের বিস্কুট তৈরি শুরু করি। এখন এর চাহিদা ভালো।’ আপাতত পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আগামী বছর বিস্কুটের পাশাপাশি কাঁঠালের ড্রাই কেক, জ্যাম, জেলি, চিপসসহ আরও কয়েক ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
কৃষক ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
কাঁঠালচাষি নজরুল ইসলাম বলেন, প্রতি বছর সংরক্ষণের অভাবে অনেক কাঁঠাল নষ্ট হয়ে যায়। এ ধরনের প্রক্রিয়াজাত শিল্প বাড়লে কৃষকের কাছ থেকে বেশি কাঁঠাল কেনা হবে, ফলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং অপচয়ও কমবে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, দেশে উৎপাদিত কাঁঠালের একটি বড় অংশ প্রতি বছর অপচয় হয়। এই অপচয় রোধে কাঁঠাল থেকে মূল্যসংযোজিত খাদ্যপণ্য উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ। কাঁঠালের বীজ, কাঁচা ও পাকা অংশ থেকে পাউডার তৈরি করে বিস্কুট, কেক, কুকিজ, ক্যান্ডিসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। এতে কৃষক ও উদ্যোক্তা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তাও জোরদার হবে।