চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল ‘বিপর্যয়’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক বলেছেন, ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, নম্বর দেওয়া যায় না।’
সোমবার (১০ আগস্ট) সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ফল ঘোষণার আগে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এবার পরীক্ষা নিতে দেরি হয়েছে। ২০২৭ সালে আমরা ৭ জানুয়ারি পরীক্ষা নেবো। এভাবে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে আনছি। অনেক সময় ক্লাস করে ফেলে এবং আমাদের বোর্ডের ১৯৮০ সালের আইন অনুযায়ী খাতা পরিদর্শনের, নিরীক্ষণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমানে আমরা এই ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা সংশোধন করেছি। যেসব ছাত্রছাত্রী তাদের খাতা পুনঃপরীক্ষার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সম্পূর্ণ খাতা পুনঃপরীক্ষণ করা হবে। কোথাও যদি কোনো ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকে, সেগুলোর বিষয়ে পুনরায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন আমি আমাদের এই রেজাল্টের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি।’
এরপর আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
‘যা নম্বর পেয়েছে, তাই দেওয়া হয়েছে’
ফলাফল প্রকাশের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘মূল প্রসঙ্গ হচ্ছে, ৫ আগস্টের পর থেকেই তো খাতা যে যা নম্বর পাচ্ছে, সেটাই দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তারপরেও এবার কেন...বিষয়টা উত্তর দেওয়ার আমার প্রয়োজন নেই। এবারের পরীক্ষায় যে যা নম্বর পেয়েছে, সেটাই দেওয়া হয়েছে। নতুন সুবিধা যেটা হয়েছে, আগে পদ্ধতি ছিল—যদি কোনো স্টুডেন্ট রি-এক্সামিন করতো, তাহলে শুধু ট্যাবুলেশন শিট দেখা হতো। সত্যিকার অর্থে ওই শিক্ষার্থীর খাতা পাল্টিয়ে গিয়েছে কিনা এবং শিক্ষক যথাযথ নম্বর দিয়েছেন কিনা, এই পুনঃপরীক্ষা করার ব্যবস্থাটি ছিল না। এবার আমরা আইনগতভাবে পরিবর্তন এনে সেই ব্যবস্থাটি দেখেছি যে প্রত্যেকটি শিক্ষার্থী তার খাতা পুনঃপরীক্ষা করার সুযোগ পেয়েছে। সেই ক্ষেত্রে কোনো মানবিক বিষয় নেই। পুনঃনিরীক্ষণে খাতা আবার কাটা হবে। এক্সাক্টলি আবার রিভিউ করা হবে ইনফ্রন্ট অব কমিটি। যদি কেউ কাউকে ভুলভাল মার্কিং করে থাকে বা যেখানে যা পাওয়ার উপযোগ রয়েছে, সেটা যদি না দিয়ে থাকে, রিভিউ কমিটির সামনে সেই খাতা পুনঃপরীক্ষা করা হবে। এক্সাক্টলি প্রত্যেক ছাত্রছাত্রী যা প্রাপ্য, তাকে দিতে হবে।’
শিক্ষাব্যবস্থা ও ফল উন্নয়নে পরিকল্পনা
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘সারাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা যদি কোনোভাবে ক্রমসংখ্যায় কমতে থাকে এবং যদি কোনো স্কুলে, কলেজে, মাদ্রাসায় পাস না করে, সেগুলোকে অ্যাড্রেস করা—এই এক্সপেরিয়েন্সটি আমার আছে এবং সেই এক্সপেরিয়েন্সের আলোকেই আমরা কাজ করবো। আমি ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত যখন পরীক্ষা সুন্দরভাবে নকল বের হয়েছিল, তখন এই জিরো পাস করার সংখ্যা এর তিন-চার গুণ ছিল। সেটা ক্রমান্বয়ে কমে এসেছিল এবং সেই ব্যবস্থাগুলো আমরা অতীতে নিয়েছি, বর্তমানেও নেব। আপনারা দেখতে পাবেন, সেগুলো আস্তে আস্তে ভালোভাবে নিশ্চয়তার সঙ্গে করতে পারেন। সেটা হচ্ছে যে আমরা যদি জিপিএর দিক থেকে দেখি, যে প্রশ্নটা আমি প্রত্যেক বছর, প্রত্যেক সরকারের আমলে করেছিলাম।’
ভর্তি পদ্ধতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এর আগে প্রশ্ন ছিল আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে যে ভর্তি কী পদ্ধতিতে হবে। তিনি বলেছিলেন, ভর্তি পুরোনো পদ্ধতিতে। অর্থাৎ মার্ক, জিপিএর ভিত্তিতে হবে। তাহলে আপনি এবার বুঝতে পারছেন যে সারা বাংলাদেশের মার্ক পেয়ে জিপিএ বেইজড এবং স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড কোয়ালিটি অনুযায়ী স্টুডেন্ট আমরা প্রোভাইড করি সারা দেশে। তাই আপনি দেখতে পাচ্ছেন, আইডিয়ালে কীভাবে ভর্তি ফি হয়, সেইভাবে অঞ্চলে, সেইভাবে আর্থসামাজিক অবস্থা কী, সেভাবে রয়েছে। সারা বিশ্বময় এটা রয়েছে এবং এটাকে অ্যাড্রেস করতে পারে লোকালি।’
শতভাগ ফেল ও ভবিষ্যৎ করণীয়
কিছু প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেল প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘শতভাগ ফেল যেসব প্রতিষ্ঠানে করেছে... আগেই বলেছি, আমার ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত শতভাগ ফেল এর পাঁচ গুণ ছিল। সেই সময় আমরা ব্যবস্থা নিয়ে ক্রমান্বয়ে সেটাকে উন্নত করেছিলাম। এবার জাস্ট অপেক্ষা করুন, ইনশাআল্লাহ। রেজাল্ট তো আজকে আসলো।’
ফল উন্নয়নের উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অনেক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। শুধু ডাকলেই কি হবে নাকি? সিরিজ অব সিস্টেম। এটা আমি ইন্ট্রোডিউস করেছিলাম ২০০১ সালে। আমাদের দায়িত্ব হলো, এই শিক্ষা যদি খারাপ হয়ে থাকে, সেটাকে উন্নত করা।’
ফলাফলের চিত্র: পাস কমেছে, জিপিএ-৫-ও হ্রাস
এবার পরীক্ষায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। গত ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ—সে হিসাবে কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ পয়েন্ট।
একই সঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। এবছর ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে, যেখানে গত বছর ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। অর্থাৎ কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন।
মানবিক বিভাগে ছেলেদের ফলাফলে সবচেয়ে বেশি অবনমন দেখা গেছে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার ৪১ দশমিক ১৪ শতাংশ—অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৫৯ জন ফেল করেছে।
‘খারাপ নয়, সুন্দর রেজাল্ট’
ফলাফল নিয়ে সমালোচনার জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের পয়েন্টগুলো (অবজার্ভেশন) দেবেন, ইনশাআল্লাহ আমরা সেগুলো নিয়ে কথা বলবো। আপনি খারাপ বলছেন কেন, কমেছে বলছেন কেন; এটা সুন্দর রেজাল্ট হয়েছে। মন খুলে গান গাওয়া যায়, মন খুলে নম্বর দেওয়া যায় না।’
অতীতের ফলাফল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি তখন ছিলাম না। আপনি বললেন (বেশি নম্বর) দেওয়া হয়েছিল, জাতি জানলো। আপনার কাছ থেকে জানলাম যে শিক্ষকদের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, আমি জানতাম না। কেউ না পড়লে তাকে নম্বর পাঠিয়ে দিলে শিক্ষার বিস্তার হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০০১ সালে দায়িত্ব পেয়েছিলাম, রেজাল্ট ছিল আপ টু ২৮ শতাংশ। আবার যখন আমরা ২০০৬ সালে দায়িত্ব ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম, রেজাল্ট বেড়েছিল আপ টু ৭৭ শতাংশ। যে আমরা রেজাল্ট যে জায়গায় ছিল, সেখান থেকে ক্রমান্বয়ে ওপরের দিকে নিয়ে যাচ্ছি, ইনশাআল্লাহ।’
কারিগরি বোর্ড ও বিষয়ভিত্তিক ফল
কারিগরি বোর্ডের ফলাফলে অসঙ্গতির বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘কারিগরি বোর্ডের কেউ যদি এখানে একটা ভুল তথ্য জানায়—শিক্ষার্থী বলছে ১ লাখ ২০ হাজার, উত্তীর্ণ সংখ্যা বলছে ২৭ হাজার সামথিং, আবার পাসের হার ৫৮ শতাংশ—এখানে একটা বড় সমস্যা হবে। আমাদের এই ধরনের মিস্টেক তো এন্টারটেইন করা যায় না। আমাদের তো এই ক্যালকুলেট নিয়ে ক্যালকুলেশন করবেন। এটা কারেক্ট করে দেন, এক্ষুণি সত্য কোনটা সেটা বলে দেন।’
নম্বর কমবেশির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলায় কম এসেছে। আবার আমি যদি বলি, আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে আমি চারদিকে এবং বোর্ডের রেজাল্ট পর্যালোচনায় লিখেছি—ইংরেজি এবং গণিত। এই দুইটা বিষয় আমরা যখন পরীক্ষা দিয়েছি, তখন থেকে শুরু করে এই দুইটা বিষয়ে ফেলের হার খুব বেশি যায় এবং পাসের হারকে কমিয়ে দেয়।’
অন্যান্য মন্তব্য ও ব্যবস্থা
এক সাংবাদিকের বক্তব্যের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আপনি নিজের পরিসংখ্যান বললেন। আপনি দেখে আসছেন, ঝরে পড়ছে। ইট ইজ এ ট্র্যাডিশন এবং ঝরে পড়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে, যেটা আপনারা বিভিন্ন সময় লিখছেন এবং আমরা কন্টিনিউয়াসলি ইমপ্রুভ করার চেষ্টা করছি। এবং এটা আমাদের জব, এটা আমরা করে যাবোই, হবে ইনশাআল্লাহ।’
লিখিত বক্তব্যে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান জানান, এ ফলাফল অর্জনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ইতিবাচক সম্পর্ক, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান ও অভিভাবকদের সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এবার পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন করে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করা হয় এবং প্রবেশপথে পুলিশ সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের ব্যবস্থা ছিল। পরীক্ষা পূর্ণ সিলেবাস ও পূর্ণ নম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এছাড়া পরীক্ষকদের জন্য কর্মশালার মাধ্যমে নির্দেশনা, উত্তরপত্র মূল্যায়নে মান নিশ্চিতকরণ, পরীক্ষার্থীদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের জন্য শেড নির্মাণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, এবারই প্রথম শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ডের নিজস্ব শর্ট কোড ১৬১৪০-এর মাধ্যমে এসএমএসে ফলাফল জানতে পারবে।