ইউরোপের বিভিন্ন পর্যটন-জনপ্রিয় শহরে অতিথি করের (ট্যুরিস্ট ট্যাক্স) প্রচলন থাকলেও যুক্তরাজ্যে এখনো এ নিয়ে ব্যাপক দ্বিধা রয়ে গেছে। হসপিটালিটি খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এমন কর চালু হলে পর্যটক সংখ্যা কমে যাবে। তবে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ইতিমধ্যে চালু হওয়া করের ওপর পরিচালিত গবেষণাগুলো বলছে ভিন্ন কথা- পর্যটক সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
হসপিটালিটি খাতের উদ্বেগ
ব্যবসায়ী সংগঠন ইউকেহসপিটালিটির হিসাব অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে রাত্রিযাপনের ওপর ৫ শতাংশ কর বসানো হলে ১ কোটি ২০ লাখ কম পর্যটক আসতে পারেন এবং ৩৩ হাজার কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যুদ্ধ, কোভিড ও ব্রেক্সিটের প্রভাবে ইতিমধ্যে চাপে থাকা এই খাতে বাড়তি কর ও কর্মসংস্থান ব্যয়ের বোঝা আরও সংকট তৈরি করবে বলে মনে করছেন তারা।
লেক ডিস্ট্রিক্ট ও ইয়র্কশায়ার ডেলসের মতো পর্যটননির্ভর অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, কর আরোপ না করা অন্য অঞ্চলে পর্যটকেরা চলে যেতে পারেন। এ কারণে স্কেগনেসসহ ইংল্যান্ডের পূর্ব উপকূলীয় বড় অংশ এবং হার্টলপুল শহর করমুক্ত থাকছে, যেহেতু রিফর্ম ইউকে ও কনজারভেটিভ দলের মেয়ররা প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন।
ইউরোপের অভিজ্ঞতা কী বলছে
আমস্টারডাম, বার্সেলোনা ও ভেনিসের মতো শহরে অতি-পর্যটন ঠেকাতে এই কর চালু করা হলেও গত এক দশকে এসব গন্তব্যে পর্যটক সংখ্যা বরং ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। আমস্টারডামে রাত্রিযাপনে অতিরিক্ত সাড়ে ১২ শতাংশ কর থাকা সত্ত্বেও-যা ইউরোপের সবচেয়ে ব্যয়বহুল পর্যটন করগুলোর একটি বলে ধরা হয়- সেখানেও পর্যটক প্রবাহে ভাটা পড়েনি।
২০২৩ সালের এপ্রিলে যুক্তরাজ্যে প্রথম রাত্রিযাপন কর চালু করে ম্যানচেস্টার, যেখানে শহরকেন্দ্রে প্রতি রাতে প্রতি কক্ষে ১ পাউন্ড কর নেওয়া হয়। ২০২৫ সালে ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই করের ফলে শহরের হোটেল অকুপেন্সিতে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব পড়েনি।
জাতীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর বিরোধিতার বিপরীতে ম্যানচেস্টারে স্থানীয় হসপিটালিটি ব্যবসায়ীরাই একটি বিজনেস ইমপ্রুভমেন্ট ডিস্ট্রিক্টের মাধ্যমে এই কর চালু করেছিলেন। স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন, তিন বছরে এই কর থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডের বেশি রাজস্ব উঠেছে, যা ব্রিট অ্যাওয়ার্ডস ও মোবো অ্যাওয়ার্ডসের মতো সাংস্কৃতিক আয়োজনে ব্যয় হয়েছে।
গত জুনে লিভারপুলেও হসপিটালিটি প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্যোগী হয়ে প্রতি রাতে ২ পাউন্ড কর চালু করে, যা থেকে খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সম্মেলন খাতে ২০ লাখ পাউন্ডের বেশি অর্থ সংগৃহীত হয়েছে।
স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের চিত্র
স্কটল্যান্ডের কাউন্সিলগুলোর আগে থেকেই স্থানীয়ভাবে রাত্রিযাপন কর বসানোর ক্ষমতা রয়েছে, আগামী এপ্রিল থেকে একই ক্ষমতা পাবে ওয়েলসও। এখন পর্যন্ত কেবল এডিনবরা গত ২৪ জুলাই ৫ শতাংশ পর্যটন কর চালু করেছে, আগামী বছর কার্ডিফ, গ্লাসগোসহ স্কটল্যান্ডের আরও তিনটি অঞ্চল একই পথে হাঁটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউকেহসপিটালিটির প্রধান নির্বাহী অ্যালেন সিম্পসন বলেছেন, এডিনবরার নতুন এই কর ইতিমধ্যে শহরের জন্য "already having damaging effects" তৈরি করছে। তবে শহরের পর্যটন খাত প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংগঠন গার্ডিয়ানকে জানায়, এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তাড়াহুড়ো হবে, এবং ম্যানচেস্টারসহ যেসব শহরে এই কর চালু হয়েছে, সেখানে পর্যটক সংখ্যায় কোনো পতন দেখা যায়নি।
গবেষণার তথ্য
ওয়েলসের ব্যাঙ্গর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যটন কর পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করে— এমন কোনো প্রমাণ নেই। গবেষকেরা দেখেছেন, ২০১৯ সাল নাগাদ ইউরোপের ২৬টি দেশের ১২৫টি গন্তব্যে এই কর চালু হয়েছিল, ব্যতিক্রম মূলত নর্ডিক ও বাল্টিক অঞ্চলে। সামান্য পরিমাণ এই করের মাধ্যমে শত শত মিলিয়ন পাউন্ডের সরকারি প্রকল্প অর্থায়ন করা হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। যেমন, ২০১৬ সাল থেকে বেলেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জে পর্যটন কর থেকে ২২ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ডের প্রকল্প অর্থায়ন হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সামাজিক আবাসন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
সমর্থকদের বক্তব্য
পর্যটন করের পক্ষে দীর্ঘদিন প্রচারণা চালানো থিংকট্যাংক আইপিপিআর নর্থের প্রধান নির্বাহী জোয়ি বিলিংহ্যাম বলেন, পুরো হসপিটালিটি খাত এই করের বিরোধী-এমন ধারণা ভুল, কারণ ম্যানচেস্টার ও লিভারপুলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাই এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যে পর্যটক সংখ্যা বাড়বে বলেই তার প্রত্যাশা, এবং এই কর সেই প্রবৃদ্ধির সুফল স্থানীয়ভাবে ভাগ করে নেওয়ার একটি বাস্তব উপায় বলে তিনি মনে করেন।
নর্দার্ন পাওয়ারহাউজ পার্টনারশিপের প্রধান নির্বাহী হেনরি মুরিসনও মনে করেন, হোটেল বিলে সামান্য কয়েক পাউন্ড বাড়লে পর্যটকেরা নিরুৎসাহিত হবেন-এমন প্রমাণ সামান্যই আছে। তার মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় ব্যবসাগুলোর দেওয়া কর পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে যায়, অথচ যে এলাকা এই কর দিচ্ছে সেখানে এর কোনো সুফল পৌঁছায় না- যা যৌক্তিক নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
-
ইংল্যান্ডের হাসপাতালে অপেক্ষমাণ তালিকা ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ
-
ডিমেনশিয়া রোগীর কেক লাগবে না বলায় বরখাস্ত কেয়ার নার্স, প্রকাশ পেল এনএইচএসের অপেক্ষমাণ তালিকার নতুন চিত্র
-
৫ বছরের ILR নিয়ে স্বস্তির ইঙ্গিত, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় যুক্তরাজ্য
-
শিশুদের ফোনে অশ্লীল ছবি ঠেকাতে অ্যাপল-গুগলকে আইনে বাধ্য করছে যুক্তরাজ্য
-
লন্ডনে বিবিসিসিআই’র ‘ব্রিটিশ-বাংলাদেশ ট্রেড সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা
আরও পড়ুন: