ইংল্যান্ডে পাঁচ বছর বয়সী এশীয় শিশুদের মধ্যে দাঁতের ক্ষয়ের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেশি বলে জানিয়েছে সরকারি সর্বশেষ পরিসংখ্যান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বৈষম্য দূর করতে "দ্রুত পদক্ষেপ" নেওয়া প্রয়োজন।
অফিস ফর হেলথ ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড ডিসপ্যারিটিজ প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে দরিদ্র এলাকাগুলোতে বসবাসরত পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের দাঁতে ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম দরিদ্র এলাকার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি—যথাক্রমে ৩২.২ শতাংশ ও ১৩.৬ শতাংশ।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে জরিপে অংশ নেওয়া স্কুলশিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২২.৪ শতাংশ) শিশুর দাঁতে ক্ষয় পাওয়া গেছে, যা গড়ে ৩.৫টি দাঁতকে প্রভাবিত করেছে। আগের বছরের তুলনায় এই হার সামান্য কম ছিল, যখন ২৩.৭ শতাংশ শিশুর দাঁতে ক্ষয় ধরা পড়েছিল।
জরিপে আরও দেখা গেছে, দাঁতের ক্ষয়ের প্রকোপ ও তীব্রতা এলাকাভেদে পরিবর্তিত হয়েছে। ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শিশুদের মধ্যে দাঁতের ক্ষয়ের হার সবচেয়ে বেশি (২৮.৭ শতাংশ)। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ের হার পাওয়া গেছে উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের ব্রেন্টে, যেখানে এই হার ৪৩.৪ শতাংশ।
প্রতিবেদনে জাতিগত বৈষম্যের একটি স্পষ্ট চিত্রও উঠে এসেছে। সব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে "অন্যান্য" শ্রেণিভুক্ত শিশুদের বাদ দিলে—যাদের ক্ষয়ের হার প্রায় অর্ধেক (৪৫.৪ শতাংশ)—সবচেয়ে বেশি হার এশীয় শিশুদের মধ্যে (৩৭.৭ শতাংশ)।
এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও পার্থক্য দেখা গেছে। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত শিশুদের (৪৩.২ শতাংশ) দাঁতে ক্ষয়ের প্রকোপ চীনা বংশোদ্ভূত শিশুদের (২৪.৬ শতাংশ) তুলনায় অনেক বেশি।
২০০৮ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে শিশুদের দাঁতের ক্ষয়ের হার ৩০.৯ শতাংশ থেকে কমে ২৩.৩ শতাংশে নেমে এসেছিল। তবে ২০১৯ ও ২০২২ সালে এই উন্নতির ধারা অব্যাহত থাকেনি, এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামান্য হ্রাস ছাড়া তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইংল্যান্ডজুড়ে দাঁতের ক্ষয়ের হারে বিদ্যমান বৈষম্য কার্যত থমকে গেছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ২০০৮ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে পাঁচ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষার্থীদের দাঁতের ক্ষয়ের বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও, তারপর থেকে এই বৈষম্যে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি।
উল্লেখ্য, এনএইচএস দন্ত চিকিৎসকের সংকট এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসরকারি দন্তচিকিৎসার ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার ইতিপূর্বে ইংল্যান্ডে দন্তচিকিৎসা ব্যবস্থা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
ব্রিটিশ ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান এডি ক্রাউচ বলেন, ওয়েস্টমিনস্টারের ব্যর্থতার কারণেই এই মৌখিক স্বাস্থ্য বৈষম্য তৈরি হয়েছে, আর তার মূল্য দিতে হচ্ছে শিশুদের। তিনি বলেন, নতুন সরকার একে "ডিকেন্সীয়" পরিস্থিতি বলে অভিহিত করলেও, পরিস্থিতি বদলাতে হলে কথা নয়, বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সরকার এই ভয়াবহ বৈষম্য দূর করাকে "নৈতিক অভিযান" বলে অভিহিত করেছিল, কিন্তু মন্ত্রীরা প্রকৃতপক্ষে দাঁতের ক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামলেই কেবল এই আখ্যা সার্থক হবে।
রয়্যাল কলেজ অব সার্জনসের ফ্যাকাল্টি অব ডেন্টাল সার্জারির ডিন ড. শার্লট একহার্ট বলেন, সাম্প্রতিক এই পরিসংখ্যান ইংল্যান্ডে ছোট শিশুদের মৌখিক স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য বৈষম্যের এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। সবচেয়ে দরিদ্র এলাকার শিশুদের দাঁতে ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম দরিদ্র এলাকার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হওয়াটা তার কাছে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, আর নির্দিষ্ট কিছু জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে এই বৈষম্য আরও প্রকট।
তিনি বলেন, লন্ডনের মতো এলাকাগুলো দেখিয়ে দেয় যে টেকসই হস্তক্ষেপ ছাড়া অর্জিত উন্নতি কতটা ভঙ্গুর হতে পারে। তার মতে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন, এবং সকল শিশুর জন্য এনএইচএস দন্তচিকিৎসা সুবিধা উন্নত করতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রতিটি শিশু যাতে তার পটভূমি নির্বিশেষে নিজের মৌখিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করতে লক্ষ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপ—যেমন তত্ত্বাবধানে দাঁত মাজার কর্মসূচি—দ্রুত চালু করা এবং এনএইচএস দন্তচিকিৎসায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টিফেন কিনোক বলেন, প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিশুকে সহজে প্রতিরোধযোগ্য দাঁতের যন্ত্রণাদায়ক ক্ষয়ে ভুগতে দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত মর্মান্তিক। তিনি আরও বলেন, রোগীদের চিকিৎসা সুবিধা বাড়াতে কোটি কোটি পাউন্ড ব্যয়ে চালু করা "নতুন রোগী প্রিমিয়াম" কর্মসূচি কার্যত কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি, যা লজ্জাজনক।
তিনি জানান, এনএইচএস দন্তচিকিৎসা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে দরিদ্র এলাকাগুলোতে তত্ত্বাবধানে দাঁত মাজার কর্মসূচিসহ একটি যথাযথ প্রাথমিক হস্তক্ষেপ পরিকল্পনা, যাতে শিশুরা আজীবন সুস্থ দাঁতের অধিকারী হতে পারে।
এছাড়া, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন রোগীদের সহায়তায় অতিরিক্ত সাত লাখ জরুরি দন্তচিকিৎসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হবে এবং আরও বেশি দন্তচিকিৎসককে এনএইচএস সেবা দিতে উৎসাহিত করতে দন্তচিকিৎসা চুক্তি সংস্কার করা হবে বলে জানান তিনি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
-
ডোভার সীমান্তে ইইউ-র নতুন নিয়মে দীর্ঘ যানজটের আশঙ্কা, রেকর্ড সংখ্যক ব্রিটিশ পর্যটকের যাত্রা
-
পানি-সংক্রান্ত সমস্যায় বন্ধ ইয়র্ক হল লেজার সেন্টার ও বি ওয়েল দ্য স্পা
-
যুক্তরাজ্যে এক বছরে প্রায় ২ হাজার স্পন্সরশিপ লাইসেন্স বাতিল, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কেয়ার সেক্টর
-
যুক্তরাজ্যে হেলথ কেয়ার ওয়ার্কার ভিসা সংকট আরও ঘনীভূত, ILR সংস্কার নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরেই টানাপোড়েন
-
যুক্তরাজ্যে চরম পানিসংকট ও বন্যাঝুঁকি: ‘হতে পারে ব্যাপক প্রাণহানি’
আরও পড়ুন: