লন্ডনের ঐতিহাসিক উইন্ডসর ক্যাসেলে রাজকীয় পরিবেশে বাংলাদেশি-ব্রিটিশ কমিউনিটি নেতা, সমাজসেবক, সাহিত্যিক ও পেশাদার হিসাবরক্ষক আবু তাহের এমবিই সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
গত ১৩ মে ২০২৬, বুধবার প্রিন্স উইলিয়ামের কাছ থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে 'মেম্বার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার' (এমবিই) সম্মাননা গ্রহণ করেন।
তাঁর দীর্ঘদিনের পেশাগত সাফল্য, সাহিত্যচর্চা, সমাজসেবা এবং কমিউনিটি উন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাজ্য সরকার তাঁকে এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননায় ভূষিত করে।
উইন্ডসর ক্যাসেলে আয়োজিত রাজকীয় অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য, বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রিন্স উইলিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে আবু তাহেরের হাতে এমবিই সম্মাননা তুলে দেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সহধর্মিণী ও জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী মিতা তাহের, একমাত্র কন্যা অনিকা তাহের এবং কনিষ্ঠ পুত্র তামিম তাহের।
সম্মাননা গ্রহণের পর আবু তাহের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, "এমবিই সম্মাননা পাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত গর্ব ও সম্মানের। এই স্বীকৃতি আমাকে সমাজ ও মানুষের কল্যাণে আরও বেশি কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে। এই অর্জন আমি আমার পরিবার, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং কমিউনিটির সকলের উদ্দেশে উৎসর্গ করছি।"
লন্ডনে বসবাসকারী আবু তাহেরের পেশাগত জীবনে যেমন রয়েছে সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, তেমনি সাংস্কৃতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও রয়েছে তাঁর অনুকরণীয় অবদান।
তাঁর পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার বুধবারীবাজার ইউনিয়নের চন্দরপুর গ্রামে। তাঁর পিতা মরহুম মোক্তার আলী এবং মাতা মাছুমা খাতুন। স্ত্রী জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মিতা তাহের এবং দুই পুত্র ও এক কন্যাসহ তিনি বর্তমানে লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগী আবু তাহের ছাত্রজীবনেই কবিতা ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হন, যা পরবর্তীকালে তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যিক যাত্রার ভিত্তি রচনা করে।
কবিতা, প্রবন্ধ ও নাটক রচনায় সমান দক্ষতার অধিকারী এই লেখকের সৃষ্টিকর্মে প্রবাসজীবন, মানবতা, সমাজসচেতনতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গভীর প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
যুক্তরাজ্যে নতুন প্রজন্মের লেখকদের অনুপ্রাণিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। বিশেষত ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: মার শালাদের মার, তদবির, পদইবাবু, বিয়ের ঘণ্টা এবং সম্বর্ধনা। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি গণমাধ্যমে প্রচারিত তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক ও টেলিফিল্মের মধ্যে রয়েছে: সম্বর্ধনা, বিয়ের ঘণ্টা, শোধ, পদইবাবু এবং গন্তব্য।
১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানোর পর আবু তাহের একজন পেশাদার হিসাবরক্ষক হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৯৯ সালে পূর্ব লন্ডনে তিনি 'মাহি অ্যান্ড কো সার্টিফাইড প্র্যাকটিসিং অ্যাকাউন্ট্যান্টস' প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে একটি সুপরিচিত ও সম্মানিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। পেশাগত দক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি ব্যক্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক পরামর্শ ও সেবা প্রদান করে আসছেন। তিনি ইনস্টিটিউট অব সার্টিফাইড প্র্যাকটিসিং অ্যাকাউন্ট্যান্টস-এর ফেলো সদস্য।
আবু তাহের 'সংহতি সাহিত্য পরিষদ‘ এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৮৮ সালে যুক্তরাজ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের তিনি প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বর্তমানে সভাপতির দায়িত্বে আছেন। তাঁর নেতৃত্বে সংগঠনটি যুক্তরাজ্যসহ আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে, যেখানে নিয়মিত কবিতা উৎসব, সাহিত্যসভা, কর্মশালা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।
দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব এবং মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে আবু তাহের সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর এই কর্মযজ্ঞ লন্ডনের বৈচিত্র্যময় কমিউনিটিতে এবং বাংলাদেশে সমানভাবে প্রশংসিত।
তিনি 'ভিশন কেয়ার ফাউন্ডেশন'-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিনামূল্যে চক্ষুসেবা, অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। 'মাছুমা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট'-এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা প্রদান করে আসছেন তিনি।
আবু তাহের 'টি৫ টেইলারিং ট্রেনিং সেন্টার' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে, বিশেষত সুবিধাবঞ্চিত নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার ক্ষেত্রে তিনি সমাজে অনুসরণীয় অবদান রেখে চলেছেন।
বাংলাদেশের শিক্ষাখাতেও আবু তাহেরের রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। তিনি সিলেটের গোলাপগঞ্জে অবস্থিত 'আল ইমদাদ ডিগ্রি কলেজ'-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।
তিনি সিলেটের ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় 'ব্রিজ অ্যাকাডেমি'র প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য হলো সকল শিশু ও তরুণকে ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে (আইসিটি) দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলা। এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের আওতায় অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণের জন্যও ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে বিশেষ কোর্সের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আবু তাহের ব্যক্তিগতভাবে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করেন।
আবু তাহেরের একটি স্বপ্নের প্রকল্প হলো 'হেভেন কেয়ার হোম'— যেখানে বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষদের জন্য একটি সম্মানজনক ও সুরক্ষিত আশ্রয় গড়ে তোলার পরিকল্পিত কাজ চলছে। তিনি বিশ্বাস করেন, সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবতার পরিচয়।
যুক্তরাজ্যে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে নবীন ও প্রবীণদের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে আবু তাহেরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর সাংগঠনিক নেতৃত্বে যুক্তরাজ্যে পর পর দুটি গোলাপগঞ্জ উৎসব সফলভাবে আয়োজিত হয়, যেখানে ৫০টিরও বেশি সংগঠন অংশগ্রহণ করে এবং প্রতিটি অনুষ্ঠানে এক হাজারেরও বেশি কমিউনিটি সদস্য যোগ দেন। উৎসবে সমাজ ও ব্যক্তিগত সাফল্যের মাধ্যমে বাংলাদেশি তথা নিজ অঞ্চলকে কমিউনিটিতে তুলে ধরার জন্য গুণীজনদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে আসা প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রবীণদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের সম্মানিত করা হয়। তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও সহিংসতার পথ থেকে ফিরিয়ে এনে বাংলাদেশি ঐতিহ্য ও শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত রাখাও এই উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
এমবিই প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ৫২বাংলাকে আবু তাহের বলেন, "সব সময়ই আমার কাজের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের কল্যাণ, সংস্কৃতির বিকাশ এবং প্রজন্মের মধ্যে মূল্যবোধের সেতুবন্ধন তৈরি করা। আমি বিশ্বাস করি, সফলতা শুধু ব্যক্তিগত অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানোই প্রকৃত সার্থকতা।"
-
সাংবাদিক ফয়সল মাহমুদের মায়ের ইন্তেকাল, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব পরিবারের শোক
-
নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর স্টারমারের পাশে গর্ডন ব্রাউন ও হ্যারিয়েট হারম্যান
-
বাংলাদেশি-ব্রিটিশ ফরহাদ হোসেন ইতিহাস গড়লেন, লেবারের মনোনয়নে নিউহ্যামের প্রথম বাংলাদেশি মেয়র
-
ইতিহাস গড়লেন লুৎফুর, চতুর্থবার টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র
-
যুক্তরাজ্যে ঈদের ছুটির দাবিতে হোয়াইটচ্যাপেলে দিনব্যাপী ক্যাম্পেইন, ১১ মে আলতাব আলী পার্কে সমাবেশ