‘ল্যারি দ্য ক্যাট’। নামটি শুনলে সাধারণ একটি বিড়ালের কথা মনে হলেও, সে কিন্তু সাধারণ নয়। ঠিকানা ১০ ডাউনিং স্ট্রিট—যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন। গত ফেব্রুয়ারিতে এই বাসভবনে নিজের দায়িত্বের ১৫ বছর পূর্ণ করেছে ল্যারি।
এই দেড় দশকে ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রী বদলেছেন ৬ জন। কেউ পদত্যাগ করেছেন, কেউ নির্বাচনে হেরেছেন, আবার কেউ দলীয় কোন্দলে ক্ষমতা হারিয়েছেন। ব্রেক্সিট, করোনা মহামারি এবং অর্থনৈতিক সংকট—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক ঝড়ের মধ্যেও ল্যারি নীরবে সাক্ষী হয়ে আছে।
ডাউনিং স্ট্রিটের মন্ত্রিপরিষদ কার্যালয়ে ইঁদুর ধরার দায়িত্বে থাকা এই বিড়ালটির সময়কাল ও প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তনের সংখ্যা এখন যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
অস্থিরতায় ব্রিটিশ রাজনীতি
একসময় ব্রিটিশ রাজনীতি স্থিতিশীলতার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। মার্গারেট থ্যাচার বা টনি ব্লেয়ারের মতো নেতারা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় ছিলেন।
কিন্তু ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে পরিস্থিতি বদলে যায়। গত ছয় বছরেরও কম সময়ে যুক্তরাজ্য পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী দেখেছে, যা এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত ক্ষমতার পরিবর্তনের উদাহরণ।
১০ ডাউনিং স্ট্রিট এখন যেন একটি ‘রিভলভিং ডোর’। এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ক্ষমতা টিকে থাকা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীরা টিকতে না পারার কারণ কী?
ডেভিড ক্যামেরন
ব্রেক্সিট গণভোটের ফলাফলের পর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ডেভিড ক্যামেরন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন মেজর বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ব্রেক্সিটের উদ্যোগই ছিল তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল।
থেরেসা মে
ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সমঝোতা এবং নিজ দলের ঐক্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হন থেরেসা মে। তিনবার চেষ্টা করেও সংসদে চুক্তি পাস করাতে পারেননি তিনি।
বরিস জনসন
বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এলেও একের পর এক কেলেঙ্কারি ও নীতিগত ব্যর্থতার কারণে বরিস জনসনকে পদত্যাগ করতে হয়।
লিজ ট্রাস
অপরিকল্পিত অর্থনৈতিক নীতির কারণে মাত্র সাত সপ্তাহের মাথায় ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন লিজ ট্রাস।
ঋষি সুনাক
২০২৪ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির বড় পরাজয়ের পর ঋষি সুনাকও ক্ষমতা হারান। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জনঅসন্তোষ ছিল তার পতনের প্রধান কারণ।
অস্থিরতার মূল কারণ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি বড় কারণ এই রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনে কাজ করছে—
- ব্রেক্সিটের কারণে দলীয় বিভাজন
- রাজনীতিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বৃদ্ধি
- বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক চাপ ও মূল্যস্ফীতি
- ২৪ ঘণ্টার মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
স্টারমারের ‘গভীর’ সংকট
২০২৪ সালের নির্বাচনে বড় জয় নিয়ে ক্ষমতায় আসেন কিয়ার স্টারমার। তিনি রাজনীতিকে জনসেবামুখী করা ও অর্থনীতি স্থিতিশীল করার প্রতিশ্রুতি দেন।
কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তার জনপ্রিয়তা কমে যায়। স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বড় ধরনের আসন হারানো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নিজ দলের ভেতর থেকেই তার পদত্যাগের দাবি উঠেছে। একাধিক মন্ত্রী ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন।
স্টারমারের জনপ্রিয়তা কমার কারণ
ভোটের অঙ্ক বনাম বাস্তবতা : সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও বাস্তবে তিনি প্রায় ৩৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন।
অর্থনৈতিক চাপ : উইন্টার ফুয়েল পেমেন্ট বাতিল, করনীতি নিয়ে বিতর্ক এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ তার সরকারকে চাপে ফেলেছে।
‘ফ্রিবি’ কেলেঙ্কারি : ব্যক্তিগত উপহার গ্রহণ এবং রাষ্ট্রদূত নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
আদর্শিক দ্বন্দ্ব : দলের ভেতরে বামপন্থী ও মধ্যপন্থীদের দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
স্টারমারের পর কে হতে পারেন?
স্টারমার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলে লেবার পার্টির ভেতর থেকেই নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে। সম্ভাব্য কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে—
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে জনপ্রিয়। তবে তিনি সংসদ সদস্য নন—এটাই তার বড় সীমাবদ্ধতা।
ওয়েস স্ট্রিটিং
বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। দক্ষ বক্তা হলেও দলের বামপন্থীদের কাছে খুব জনপ্রিয় নন।
অ্যাঞ্জেলা রেনার
দলের বামপন্থী অংশে জনপ্রিয়। তবে অতীতের কর বিতর্ক তার দুর্বলতা।
কনজারভেটিভ ও অন্যান্য দলের অবস্থান
লেবার পার্টির সংকটের সুযোগে কনজারভেটিভরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী দল দ্রুত জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে।
গ্রিন পার্টিও লেবারের অসন্তুষ্ট ভোটারদের টানছে।
ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতির কারণে কম ভোট পেয়েও বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব হয়। ফলে জনগণের প্রকৃত সমর্থন ও সংসদীয় ক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়।
ভবিষ্যৎ কী?
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যে কোনো প্রধানমন্ত্রীর পূর্ণ মেয়াদ শেষ করা কঠিন হয়ে উঠছে। অর্থনৈতিক চাপ, মিডিয়ার প্রভাব এবং রাজনৈতিক বিভাজন এই অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
নির্বাচনী ব্যবস্থায় পরিবর্তন না এলে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের ‘ঘূর্ণায়মান দরজা’ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
মোজাক্কির রিফাতের প্রতিবেদন অবলম্বনে
-
নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর স্টারমারের পাশে গর্ডন ব্রাউন ও হ্যারিয়েট হারম্যান
-
বাংলাদেশি-ব্রিটিশ ফরহাদ হোসেন ইতিহাস গড়লেন, লেবারের মনোনয়নে নিউহ্যামের প্রথম বাংলাদেশি মেয়র
-
ইতিহাস গড়লেন লুৎফুর, চতুর্থবার টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র
-
যুক্তরাজ্যে ঈদের ছুটির দাবিতে হোয়াইটচ্যাপেলে দিনব্যাপী ক্যাম্পেইন, ১১ মে আলতাব আলী পার্কে সমাবেশ
-
যুক্তরাজ্য বিএনপির ৪১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন