লিওনেল মেসির সঙ্গে লামিন ইয়ামালের তুলনা এখন ফুটবল বিশ্বে অন্যতম আলোচিত বিষয়। খেলার ধরনে যেমন মিল আছে দুজনের, তেমনি অভিজ্ঞতা ও অর্জনে আছে স্পষ্ট ব্যবধান—নিচে সেই বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
১০টি মিল
১. দুজনই লা মাসিয়ার সৃষ্টি
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল একাডেমি বার্সেলোনার লা মাসিয়া। মেসির মতোই ইয়ামালও এই একাডেমি থেকেই বিশ্বমঞ্চে উঠে এসেছেন।
২. দুজনই বাঁ-পায়ের জাদুকর
মেসির সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তাঁর বাম পা। ইয়ামালও বাঁ-পায়ের অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ, কার্লিং শট এবং নিখুঁত পাসের জন্য পরিচিত।
৩. ডান উইং থেকে ভেতরে কেটে আসার অভ্যাস
দুজনই সাধারণত ডান প্রান্তে খেলেন, কিন্তু বল নিয়ে ভেতরে ঢুকে বাম পায়ে শট নেওয়া বা সুযোগ তৈরি করাই তাঁদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
৪. অসাধারণ ড্রিবলিং
দুজনেরই বল পায়ে রাখার ক্ষমতা অসাধারণ। তবে ড্রিবলিংয়ের ধরনে পার্থক্য থাকলেও প্রতিপক্ষকে এক এক করে কাটিয়ে ওঠার দক্ষতা দুজনেরই রয়েছে।
৫. খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা
শুধু গোল করাই নয়, ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ এবং সতীর্থদের খেলায় যুক্ত করার ক্ষমতাও দুজনের বড় শক্তি।
৬. কম বয়সেই বিশ্বজুড়ে পরিচিতি
মেসি যেমন অল্প বয়সেই ইউরোপ কাঁপিয়েছিলেন, তেমনি ইয়ামালও কিশোর বয়সেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা হয়ে উঠেছেন।
৭. বড় ম্যাচে সাহসী পারফরম্যান্স
চাপের ম্যাচে ভয় না পেয়ে দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা দুজনের মধ্যেই দেখা যায়।
৮. গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্টেও দক্ষ
দুজনই শুধু গোলদাতা নন; সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও সমান কার্যকর।
৯. ফুটবল বুদ্ধিমত্তা
খালি জায়গা খুঁজে বের করা, প্রতিপক্ষের অবস্থান বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মুহূর্তেই খেলার চিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁদের অন্যতম মিল।
১০. ভক্তদের বিশাল প্রত্যাশা
মেসির ওপর যেমন বছরের পর বছর কোটি ভক্তের প্রত্যাশা ছিল, ইয়ামালের দিকেও এখন একই রকম প্রত্যাশার চোখে তাকিয়ে আছে ফুটবল বিশ্ব।
- ৫টি বড় অমিল
১. অভিজ্ঞতার ব্যবধান
মেসি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। ইয়ামালের ক্যারিয়ার এখনও শুরুর পর্যায়ে। তাই দুজনের অর্জনের তুলনা এখনই ন্যায্য নয়।
২. গোল করার ধার
ক্যারিয়ারের শুরুতে মেসি তুলনামূলকভাবে বেশি গোলমুখী ছিলেন। অন্যদিকে ইয়ামাল গোলের পাশাপাশি সুযোগ তৈরি ও অ্যাসিস্টে বেশি ভূমিকা রাখেন। একই বয়সে গোল-অ্যাসিস্টের তুলনায় দুজনের শক্তির ক্ষেত্র কিছুটা আলাদা।
৩. শারীরিক গঠন ও গতি
মেসির নিচু কেন্দ্রাভিকর্ষণ (লো সেন্টার অব গ্র্যাভিটি) তাঁকে ড্রিবলিংয়ে অনন্য করেছে। ইয়ামাল তুলনামূলকভাবে লম্বা এবং উইং থেকে গতি ও কৌশলের সমন্বয়ে খেলেন।
৪. খেলার ধরন
মেসি ধীরে ধীরে ফলস নাইন, প্লেমেকার ও গোলস্কোরার—সব ভূমিকায় নিজেকে রূপান্তর করেছেন। ইয়ামাল এখনও মূলত সৃজনশীল উইঙ্গার, যিনি এক-এক পরিস্থিতি, ক্রস এবং সুযোগ তৈরিতে বেশি স্বচ্ছন্দ।
৫. উত্তরাধিকার বনাম সম্ভাবনা
মেসি ইতিমধ্যেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা হিসেবে নিজের স্থান নিশ্চিত করেছেন। ইয়ামাল এখনও নিজের উত্তরাধিকার গড়ার পথে। তাঁর সামনে সম্ভাবনার দুয়ার খোলা, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কিংবদন্তিতে রূপ দিতে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে।
- পরিসংখ্যান কী বলছে?
একই বয়সে ইয়ামালের ম্যাচসংখ্যা, গোলে অবদান ও অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রেই নজরকাড়া। এর একটি কারণ, তিনি আরও কম বয়সে সিনিয়র দলে অভিষেক করেছেন। তবে একই সময়ে মেসির গোল করার দক্ষতা ও প্রতি মিনিটে অবদানের হার অনেক বিশ্লেষণে এগিয়ে ছিল। তাই কাঁচা পরিসংখ্যানের পাশাপাশি প্রেক্ষাপট—বয়স, খেলার সময়, দল এবং প্রতিযোগিতার মান—বিবেচনা করা জরুরি।
আরও পড়ুন-https://52banglatv.com/sports/news/48788
তুলনা কি ন্যায্য?
প্রায় প্রতিটি প্রজন্মই নতুন কোনো প্রতিভাকে মেসির সঙ্গে তুলনা করেছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, মেসি হওয়া শুধু প্রতিভার বিষয় নয়; বছরের পর বছর ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করার বিষয়। ইয়ামাল নিঃসন্দেহে অসাধারণ প্রতিভাবান, তবে তাঁর ক্যারিয়ারের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে আরও সময় লাগবে।
মেসি ও ইয়ামালের তুলনা আসলে দুই যুগের গল্প। একজন নিজের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন, অন্যজন সেই পথেই হাঁটছেন। মিল অনেক থাকলেও সবচেয়ে বড় সত্য হলো—মেসি একজন সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত কিংবদন্তি, আর ইয়ামাল এখনও নিজের ইতিহাস লিখছেন। তাই তাঁকে "নতুন মেসি" বলার চেয়ে "প্রথম লামিন ইয়ামাল" হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়াই হয়তো ফুটবলের জন্য সবচেয়ে ভালো।
সূত্র: Olympics, FIFA ও FC Barcelona।