ঢাকা ১ শ্রাবণ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
ঢাকা ১ শ্রাবণ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

ফকল্যান্ড যুদ্ধ থেকে মাঠের বৈরিতায় মুখোমুখি ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৩ পিএম

ফকল্যান্ড যুদ্ধ থেকে মাঠের বৈরিতায় মুখোমুখি ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা

ফুটবলের কিছু ম্যাচ কেবল ৯০ মিনিটের প্রতিযোগিতা নয়। এমন কিছু লড়াই আছে যেখানে বল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসে যুদ্ধের স্মৃতি, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, প্রতিশোধ আর ইতিহাসের ভার। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড এমনই এক দ্বৈরথ—যেখানে প্রতিটি পাসের পেছনে লুকিয়ে থাকে ইতিহাস, আর প্রতিটি গোল হয়ে ওঠে প্রজন্মের আবেগের প্রতিফলন।

২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি এই দুই দল। ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের পুনর্মিলন যেন পুরোনো ক্ষতকে আবার উসকে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন—নতুন ইতিহাস লেখা হবে, নাকি পুরোনো অধ্যায়ই ফিরে আসবে?

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড বৈরিতার সূত্রপাত ফুটবলের অনেক আগেই। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধ দুই দেশের সম্পর্কে গভীর ক্ষত তৈরি করে। ৭৪ দিনের এই সংঘাতে শত শত প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধ শেষ হলেও মানুষের মনে রয়ে যায় ক্ষোভ ও বেদনা।

দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। ২ এপ্রিল আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা দ্বীপটি দখল করলে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার নৌবাহিনী পাঠান পুনর্দখলের জন্য।

এই যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। শেষ পর্যন্ত জয় পায় যুক্তরাজ্য। প্রায় ৩০ বছর পর, ২০১৩ সালে ফকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ বাসিন্দা ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে মত দেন, যদিও এই ফল নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

ভৌগোলিকভাবে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে মাত্র ৩০০ মাইল দূরে, অথচ ব্রিটেন থেকে প্রায় ৮ হাজার মাইল দূরে অবস্থিত। ঐতিহাসিক কারণে আর্জেন্টিনা এটিকে মালভিনাস নামে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে, অন্যদিকে ১৮৩৩ সাল থেকে ব্রিটেন সেখানে শাসন চালিয়ে আসছে।

১৯৮৬ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হলে ম্যাচটি আর শুধু ফুটবল ছিল না। আর্জেন্টিনার কাছে এটি ছিল প্রতিশোধের সুযোগ, ইংল্যান্ডের কাছে মর্যাদার লড়াই।

মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে দিয়েগো ম্যারাডোনা তৈরি করেন ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত মুহূর্ত। তিনি হাত দিয়ে গোল করে দেন, যা বৈধ ঘোষণা করেন রেফারি। পরে ম্যারাডোনা বলেন, ‘গোলটি হয়েছিল অল্পটা ম্যারাডোনার মাথা, আর অল্পটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।’

ইংল্যান্ডের কাছে এটি প্রতারণা হলেও আর্জেন্টিনার অনেক সমর্থকের কাছে এটি ছিল প্রতীকী প্রতিশোধ। এরপর মাত্র পাঁচ মিনিট পর ম্যারাডোনা নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে পাঁচজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করেন অবিশ্বাস্য গোল, যা পরে FIFA ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

একই ম্যাচে এমন দুই বিপরীতধর্মী গোল—একটি বিতর্কিত, অন্যটি নান্দনিক—ফুটবল ইতিহাসে বিরল। ম্যারাডোনা পরে বলেন, ‘এটি ছিল ম্যারাডোনার মাথা আর ঈশ্বরের হাতের একটু মিশ্রণ।’ আরেক সাক্ষাৎকারে তিনি এটিকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ‘প্রতীকী প্রতিশোধ’ বলে উল্লেখ করেন।

ম্যাচ শেষে তিনি স্বীকার করেন, এই জয় শুধুই ফুটবলের ছিল না, বরং একটি দেশের বিরুদ্ধে প্রতীকী বিজয়। তিনি বলেন, ‘যদিও আমরা ম্যাচের আগে বলেছিলাম যে এই খেলার সাথে যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু আমরা সবাই জানতাম যে সেখানে (ফকল্যান্ড যুদ্ধে) অনেক আর্জেন্টাইন তরুণ মারা গেছে, যাদের পাখির মতো গুলি করে মারা হয়েছিল। আর তাই এই জয়টি ছিল আমাদের এক ধরণের প্রতীকী প্রতিশোধ।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি ছিল এমন একটা অনুভূতি, যেন আমরা শুধু একটি ফুটবল দলকে হারাইনি, বরং একটা পুরো দেশকে হারিয়েছি।’

পরবর্তীতে আত্মজীবনীতে ম্যারাডোনা লেখেন, ‘আমাদের বুটের নিচে কোনো বন্দুক ছিল না, কিন্তু আমাদের মাথায় তীব্র ক্ষোভ ছিল। আমরা এমন একটা ম্যাচ খেলছিলাম যেখানে আমাদের দেশের সম্মান জড়িয়ে ছিল। আমরা সাধারণ মানুষের মুখে একটু হাসি ফোটাতে চেয়েছিলাম।’

১৯৯৮ বিশ্বকাপে আবারও উত্তেজনা ছড়ায় এই দ্বৈরথে। ডিয়েগো সিমিওনের সঙ্গে সংঘর্ষে ডেভিড বেকহ্যাম লাল কার্ড দেখেন। ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ালে জয় পায় আর্জেন্টিনা। দেশে ফিরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন বেকহ্যাম, এমনকি তাকে জাতীয় খলনায়কও বলা হয়। পরে সিমিওনে স্বীকার করেন, তিনি ঘটনাটি নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন।

২০০২ বিশ্বকাপে আবার দেখা হলে বেকহ্যাম পেনাল্টি থেকে একমাত্র গোল করে ইংল্যান্ডকে জয় এনে দেন। ১৯৯৮ সালের সমালোচনার জবাব দেন মাঠেই।

অনেকে মনে করেন, এই বৈরিতা ম্যারাডোনা থেকেই শুরু। বাস্তবে এর সূচনা আরও আগে, ১৯৬৬ বিশ্বকাপে। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনের বিতর্কিত লাল কার্ড দুই দেশের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে। ইংল্যান্ড কোচ আলফ রামসে তখন আর্জেন্টাইনদের “জানোয়ার” বলে মন্তব্য করেছিলেন।

দীর্ঘ ২৪ বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবার মুখোমুখি দুই দল। আর্জেন্টিনার হয়ে আছেন লিওনেল মেসি, অন্যদিকে ইংল্যান্ডে জুড বেলিংহ্যাম ও হ্যারি কেইনের মতো তারকা। দুই দলের কোচই অতীত ভুলে বর্তমান ম্যাচে মনোযোগ দিতে বললেও ইতিহাস কি এত সহজে ভোলা যায়?

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ মানেই নাটক, বিতর্ক, আবেগ, প্রতিশোধ আর স্মরণীয় মুহূর্ত। ১৯৬৬, ১৯৮৬, ১৯৯৮, ২০০২—প্রতিটি অধ্যায়ই ফুটবল ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

২০২৬ সালের এই সেমিফাইনালেও সেই ইতিহাসের ভার দুই দলের কাঁধে। আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি ও মেসি অতীত নয়, বর্তমানেই মনোযোগ দিতে চান। কিন্তু এমন ঐতিহাসিক লড়াইয়ে অতীতকে পুরোপুরি আলাদা করা কি সম্ভব?

হয়তো না। কারণ আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড মানেই কেবল ফুটবল নয়—এটি ইতিহাস, আবেগ, প্রতিশোধ আর নতুন স্বপ্নের এক জীবন্ত প্রতিফলন।

এই দ্বৈরথে প্রতিপক্ষ শুধু ১১ জন ফুটবলার নয়—প্রতিপক্ষ ইতিহাসও।