প্রকাশ্যে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পানি বা তরল ছুড়ে মারা, দলবদ্ধভাবে হেনস্থা করা এবং সেই ঘটনার ভিডিওচিত্র ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়াকে ইতালির আইন অত্যন্ত গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।
সম্প্রতি ভেনিসে বাংলাদেশি অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনাটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইতালীয় দণ্ডবিধি ও অভিবাসন আইন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ ধরনের অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের শুধু কয়েক বছরের জেল-জরিমানাই নয়, বরং ইতালিতে তাদের বৈধ রেসিডেন্স পারমিটও চিরতরে বাতিল হয়ে যেতে পারে।
শারীরিক ও মানসিক হেনস্থা: সর্বোচ্চ ৬ বছরের কারাদণ্ড
ইতালীয় দণ্ডবিধির ৬৭৪ ধারা অনুযায়ী প্রকাশ্য স্থানে কারও ওপর পানি বা যেকোনো তরল নিক্ষেপ করা সামাজিক শান্তি বিনষ্টকারী অপরাধ। তবে এটি জোরপূর্বক কারও পথরোধ করে বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করে সংঘটিত হলে তা ৬১০ ধারায় ‘ভায়োলেন্সা প্রিভাতা’ হিসেবে গণ্য হয়, যার সাজা সর্বোচ্চ ৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।
কাউকে উত্ত্যক্ত করা বা প্রকাশ্যে হেনস্থার অপরাধে ১ থেকে ৬ বছর ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। অপরাধটি এককভাবে না হয়ে দলবদ্ধভাবে সংঘটিত হলে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী সাজার মেয়াদ আরও বাড়ে।
ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ: পৃথক ডিজিটাল অপরাধ
ভুক্তভোগীর অনুমতি ছাড়া অপমানজনক ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা ইতালির সাইবার ও গোপনীয়তা আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। এর ফলে সাইবার বুলিং ও অনলাইন মানহানির পৃথক মামলা যুক্ত হয়, যাতে ১ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং মোটা অঙ্কের জরিমানা হতে পারে।
প্রবাসীদের জন্য চূড়ান্ত ঝুঁকি: পারমিট বাতিল ও ডিপোর্টেশন
কোনো প্রবাসী বা অভিবাসী এ ধরনের অপরাধে যুক্ত হলে ফৌজদারি শাস্তির পাশাপাশি অভিবাসন আইনের অধীনে সরাসরি প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। ইতালীয় সমন্বিত অভিবাসন আইন অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক সামাজিক নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের জন্য হুমকি বলে প্রমাণিত হলে তার বিদ্যমান রেসিডেন্স পারমিট বাতিল হতে পারে অথবা নবায়নের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশ কমিশনার বা আদালত সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ইতালি ও পুরো শেঙ্গেন এলাকা থেকে ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিতে পারে।
আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য আরও কঠোর পরিণতি
যারা রাজনৈতিক আশ্রয় বা মানবিক কারণে ইতালিতে বসবাস করছেন কিংবা যাদের আবেদন প্রক্রিয়াধীন, তাদের জন্য এই আইন আরও কঠোর। আন্তর্জাতিক সুরক্ষায় থাকা কোনো ব্যক্তি জনপরিসরে সহিংসতা বা অপরাধে যুক্ত হলে তার আশ্রয় বা রেফ্যুজি স্ট্যাটাস তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। আঞ্চলিক কমিশনে যাদের আবেদন প্রক্রিয়াধীন, পুলিশের রিপোর্টে নাম এলেই তাদের আবেদনও ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় বাতিল হতে পারে।
আইনি সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লাগলেও পুলিশের প্রাথমিক রিপোর্ট বা চার্জশিটের ভিত্তিতেই অভিবাসন কার্যালয় পারমিট স্থগিত করতে পারে। ইতালীয় বিচার বিভাগ দলবদ্ধ সহিংসতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানিকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে দেখে থাকে বলে জানা গেছে। প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিকে ইতালির আইনি শৃঙ্খলা মেনে চলার ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র: ইতালীয় দণ্ডবিধি (Codice Penale) ও সমন্বিত অভিবাসন আইনের (Testo Unico sull'Immigrazione) প্রকাশ্য বিধানের ভিত্তিতে ৫২বাংলার বিশ্লেষণ
-
অভিনেত্রী বাঁধনের ওপর হামলা: নড়েচড়ে বসেছে ভেনিস প্রশাসন
-
ইতালিতে অভিনেত্রী বাঁধনকে হেনস্তা, হামলায় জড়িতদের পরিচয় প্রকাশ
-
সিডনির ক্যামডেন কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র হলেন বাংলাদেশি এলিজা
-
বাঁধনের ওপর হামলার প্রতিবাদে ইতালিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে এনসিপি ডায়াস্পোরার স্মারকলিপি
-
ইতালিতে বছরে ১০ হাজার বাংলাদেশির বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ