গ্রিসের থেসালোনিকি থেকে জার্মানির মেমিংগেনগামী একটি রায়ানএয়ার (মাল্টা এয়ার পরিচালিত) ফ্লাইটে ইঞ্জিনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ থেকে ছিটকে আসা টুকরো জানালায় আঘাত করে জানালা ভেঙে ফেলার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন যাত্রী লিউবিসা কারোভিচ (৬১)। ঘটনার সময় বিমানের চাপ কমে যাওয়ায় তাঁর শরীরের অর্ধেক অংশ ভাঙা জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়, তবে সহযাত্রীদের সহায়তায় প্রাণে বেঁচে যান তিনি।
গত ১০ জুলাই বিমানটি উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই এই ঘটনা ঘটে। বিমানের কেবিন প্রেসার হারিয়ে ফেলায় জরুরি ভিত্তিতে থেসালোনিকিতে ফিরে আসতে বাধ্য হয় এটি। রায়ানএয়ারের প্রধান নির্বাহী মাইকেল ও'লিয়ারি সোমবার জানান, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে ইঞ্জিনে "ফরেন-অবজেক্ট ড্যামেজ" হয়েছিল, যদিও প্রকৃত কারণ এখনো তদন্তাধীন।
সার্বিয়ান উদ্যোক্তা কারোভিচ দ্য গার্ডিয়ানকে জানান, বিস্ফোরণের ঠিক আগের মুহূর্তগুলোর স্মৃতিই তাঁকে রাতে ঘুমাতে দেয় না। তিনি বলেন, বিস্ফোরণের শব্দটাই তাঁর সবচেয়ে বেশি মনে আছে। তিনি জানান, তাঁকে বলা হয়েছে যে তিনি দুইবার জ্ঞান হারিয়েছিলেন এবং বাতাসের প্রবল চাপে তাঁর মুখ সাময়িকভাবে ফুলে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল।
কারোভিচের স্ত্রী স্বেতলানা তখন তিন সারি পেছনে বসেছিলেন। ঘটনার সময় তিনি দৌড়ে গিয়ে স্বামীকে ধরে ফেলেন, যিনি প্রায় দুই মিনিট ধরে বিমানের ভেতরে-বাইরে ঝুলে ছিলেন। স্বেতলানা জানান, কেবিন ক্রুর কেউ সাহায্য করেননি, বরং সহযাত্রীরাই এগিয়ে আসেন। তিনি বিশেষভাবে এক আলবেনিয়ান যাত্রীর কথা উল্লেখ করেন, যিনি প্রথমে ব্যাগ দিয়ে ও পরে একটি স্যুটকেস দিয়ে জানালাটি বন্ধ করার চেষ্টা করেন এবং শেষ পর্যন্ত সফল হন।
রায়ানএয়ার অবশ্য কেবিন ক্রু যথাযথ সাড়া দেয়নি এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটি দ্য গার্ডিয়ানকে জানায়, চাপ কমে যাওয়া ও দ্রুত অবতরণের সময় সব যাত্রী ও ক্রুকে আসনে বসে অক্সিজেন মাস্ক পরে থাকতে হয়েছিল, এবং বিমান নিরাপদ উচ্চতায় নামার পর ক্রু কারোভিচের পরিচর্যা করে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করে। ক্রু সব নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করেছিল কি না, তা তদন্তকারীরা এখনো প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেননি।
ঘাড় ও কাঁধে আঘাত এবং ঘর্ষণজনিত পোড়ার ক্ষত নিয়ে কারোভিচকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসকরা তাঁকে জানিয়েছেন, সুস্থ হতে সময় লাগবে এবং আগামী ছয় সপ্তাহ তাঁকে নেক ব্রেস পরে থাকতে হবে, তারপর অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন আছে কি না তা নির্ধারণ করা হবে। কারোভিচ বলেন, তিনি ভাগ্যবান যে এখনো বেঁচে আছেন, যদিও ঘটনার বেশিরভাগ কথা তাঁর মনে নেই এবং মাথা ও ঘাড়ে এখনো ব্যথা রয়েছে।
সিটবেল্ট বাঁধা থাকার কারণেই তিনি সম্পূর্ণভাবে জানালা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছেন বলে মনে করেন কারোভিচ, যদিও অন্য কোনো কারণও থাকতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, এটা হয়তো সিটবেল্টের কারণেই হয়েছে, অথবা হয়তো এটাই তাঁর নিয়তি। ঈশ্বরে বিশ্বাসী কারোভিচ প্রতিদিন তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের কথাও জানান।
কারোভিচের আইনজীবী ভাসিলিস সিয়ারাস বলেন, তাঁর মক্কেল "ভুলবশত এখনো জীবিত"। তিনি জানান, কেবিনের চাপ হারানোর সময় কারোভিচের বুক থেকে ওপরের অংশ জানালা দিয়ে বাইরে ছিটকে যায় এবং তিনি তৎক্ষণাৎ জ্ঞান হারান। প্রায় ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায়, ঘণ্টায় ৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে চলা বিমানে তাঁর মাথা ও ডান হাত বিমানের বাইরে ছিল বলে জানান আইনজীবী।
ফ্লাইট রেকর্ড অনুযায়ী, ২০০৮ সালে রায়ানএয়ারের বহরে যুক্ত হওয়া বিমানটি উড্ডয়নের প্রায় ছয় মিনিট পর ১৫ হাজার ফুট উচ্চতা অতিক্রম করার পর প্রায় ৬ হাজার ফুটে নেমে আসে। জ্বালানি পোড়ানোর জন্য প্রায় ৩০ মিনিট এই নিচু উচ্চতায় থাকার পর উড্ডয়নের প্রায় এক ঘণ্টা পর বিমানটি থেসালোনিকিতে ফিরে আসে বলে জানিয়েছে ফ্লাইট-ট্র্যাকিং সাইট ফ্লাইটরাডার২৪।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড এই তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছে, যেহেতু গ্রিসের হেলেনিক এয়ার অ্যান্ড রেল সেফটি ইনভেস্টিগেশন অথরিটি তদন্তের দায়িত্ব মার্কিন সংস্থাটির কাছে হস্তান্তর করেছে। গ্রিক তদন্তকারীরাও এতে অংশ নিচ্ছেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান