দীর্ঘ দুই বছর ধরে দেশছাড়া, নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন বিশিষ্ট লেখক, চিন্তক ও বুদ্ধিজীবী ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। মননে যাঁর একাত্তর, ধ্যানে যাঁর মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তরাঙা দিনগুলো এবং ভাষায় যিনি বহন করেন প্রজন্মের জন্য উজ্জ্বল আগামীর স্বপ্ন। সংক্ষিপ্ত সফরে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন তিনি, আর তাঁকে ঘিরেই আয়োজিত হয় এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান।
২০২৬ সালের ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলা ও নবী-জিনাত সাহিত্য পুরস্কারে’ ভূষিত হয়েছেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। গত মে মাসে বইমেলায় তাঁকে এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। তবে পুরস্কারটি তাঁর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দিতে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ড. নুরুন নবীর নিউজার্সির বাসভবনের বিশাল আঙিনায় গত ১৯ জুলাই ২০২৬ আয়োজিত হয় এই সম্মাননা অনুষ্ঠান।
দিনটি ছিল বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের তিরোধান দিবস। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। তাঁকে স্মরণ করেই শুরু হয় অনুষ্ঠানমালা। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে সমবেত হন বিপুলসংখ্যক সুধীজন। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ড. ইয়াসমিন হককে ঘিরে জমে ওঠে জমজমাট আড্ডা। বেলা দেড়টা থেকে শুরু হয় পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদান পর্ব।
একাত্তরের প্রহরী ফাউন্ডেশনের সদস্যসচিব ভূমিকামূলক বক্তব্য দিয়ে মঞ্চে আহ্বান জানান ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও বইমেলার আহ্বায়ক ড. নুরুন নবীকে, যিনি এই পুরস্কার প্রবর্তনেরও অন্যতম উদ্যোক্তা। এরপর তিনি একে একে মঞ্চে ডেকে নেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ড. ইয়াসমিন হক, ড. জিনাত নবী এবং বিশিষ্ট চিন্তক বেলাল বেগকে।
ড. নুরুন নবী তুলে ধরেন এই পুরস্কার প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট। তিনি বলেন, এক চরম সংকটকালে তাঁরা এই বইমেলার আয়োজন শুরু করেছিলেন, যখন বাংলাদেশ থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছিল। যাঁরা বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তর নিয়ে লেখালেখি করেন, তাঁরাই এই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবেন বলে জানান তিনি এবং যোগ করেন, একাত্তরের চেতনা সমুন্নত রেখে তাঁরা এগিয়ে যাবেন।
এরপর মূল অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান কবি ফকির ইলিয়াসের হাতে। উপস্থিত সবাইকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের হাতে এই সম্মাননা তুলে দিতে পেরে তাঁরা আনন্দিত ও গর্বিত।
তিনি জানান, পুরস্কার নির্বাচন কমিটি গভীর বিবেচনা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের নাম বাছাই করেছে। এই কমিটিতে ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক তাজুল মোহাম্মদ (কানাডা), বিশিষ্ট লেখক ড. আতাউল করিম (আরকানসাস), বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সালমা বাণী (কানাডা), বিশিষ্ট লেখক সেজান মাহমুদ (কানেকটিকাট), বিশিষ্ট সংগঠক স্বীকৃতি বড়ুয়া (নিউইয়র্ক), একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক ড. নুরুন নবী (নিউজার্সি) ও কবি ফকির ইলিয়াস (নিউইয়র্ক)। এরপর তিনি ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
ড. নুরুন নবীর নেতৃত্বে উপস্থিত সুধীবৃন্দ সম্মাননা পদক তুলে দেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের হাতে, আর দুই হাজার ডলারের আর্থিক সম্মাননা তুলে দেন ড. জিনাত নবী। এ সময় বক্তব্য রাখেন ড. ইয়াসমিন হক। তিনি তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন এবং বলেন, তাঁরা দুই বছর ধরে দেশহীন অবস্থায় আছেন, তবে বাংলাদেশেই ফিরতে চান।
ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁর বক্তব্যে বলেন, একাত্তরের চেতনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান মুছে ফেলার প্রচেষ্টা সফল হওয়ার নয়, কারণ এই দেশ বঙ্গবন্ধুর চেতনার উত্তরাধিকার। তিনি নিজের পিতাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে হারানোর মর্মস্পর্শী স্মৃতিচারণ করেন এবং বলেন, ড. নুরুন নবীর মতো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের বিনিময়েই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। তিনি এই প্রজন্মকে একাত্তরের চেতনায় গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় সফল হয়েছেন বলে মন্তব্য করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী তাঁর ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যে আরও বিনিয়োগে উৎসাহিত করার কথা জানান।
এছাড়া বাংলাদেশকে সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিদের বিচার হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি এবং ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লক্ষাধিক নারীর আত্মত্যাগে অর্জিত বাংলাদেশে ফেরার প্রত্যাশা প্রকাশ করেন। তিনি একাত্তরের প্রহরী ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাদের কার্যক্রমকে প্রেরণাদায়ক বলে অভিহিত করেন।
সমাপনী বক্তব্যে ড. নুরুন নবী উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দুপুরের আহারে আমন্ত্রণ জানান। বইমেলা সার্থক করতে গ্র্যান্ড স্পনসর, স্পনসর, বিজ্ঞাপনদাতা, লেখক, সাংবাদিক, প্রকাশক ও অংশগ্রহণকারী সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি। অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ফোবানা সেন্ট্রাল কমিটির চেয়ারম্যান জাকারিয়া চৌধুরী, যিনি আগামী ৪, ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিতব্য ফোবানা সম্মেলনে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে প্রধান অতিথি হওয়ার আমন্ত্রণ জানান। এছাড়া কথা বলেন ২০২৫ সালের পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ডা. সেজান মাহমুদ।
সকাল সাড়ে এগারোটা থেকেই অনুষ্ঠানস্থল ছিল আড্ডামুখর। স্ন্যাকস ও এপিটাইজারসহ বিকেলের চা-পর্বে ছিল নানা মুখরোচক খাবারের আয়োজন। শতাধিক সুধীজনের উপস্থিতিতে বিকেল তিনটায় শেষ হয় মূল অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্ব। এদিনই নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল, যা বড় পর্দায় উপভোগ করেন উপস্থিত অতিথিরা।
সূত্র: সিলেটভিউ২৪ডটকম