ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মূল যুক্তি
যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন কারণ তুলে ধরলেও তাদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য যুক্তি ছিল—ইরান-এর পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা জরুরি।
আইএইএর প্রতিবেদনে ইউরেনিয়াম মজুত
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা গত মে মাসের প্রতিবেদনে জানায়, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪০৮ দশমিক ৬ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে। এই মজুত আরও সমৃদ্ধ করা হলে অন্তত ৯টি পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব।
ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ও আঞ্চলিক উদ্বেগ
ইরানের কাছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে—যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে তাদের সমর্থন পশ্চিমাদের জন্য উদ্বেগের কারণ।
ট্রাম্পের স্পষ্ট অবস্থান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেব্রুয়ারিতে বলেন,
“ইরান পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না। বিষয়টি খুব সহজ—তাদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসবে না।”
হামলা কি ইরানকে থামাবে?
বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক স্থাপনা ও বিজ্ঞানীদের ওপর হামলা সাময়িকভাবে অগ্রগতি থামালেও ইরানের সরকার টিকে গেলে তারা আরও বেশি করে পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে ঝুঁকতে পারে।
‘বেঁচে থাকার গ্যারান্টি’ হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রমেশ ঠাকুর বলেন,
“ইরানের জন্য এখন পারমাণবিক অস্ত্রই হলো টিকে থাকার একমাত্র নিশ্চয়তা। তাই তারা কেন এটা তৈরি বা সংগ্রহ করবে না?”
নিরাপত্তা কৌশল হিসেবে পারমাণবিক বোমা
ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ-এর বিশ্লেষক জেনিফার কাভানাঘ বলেন,
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দ্রুত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক অস্ত্রই হতে পারে সহজ পথ।
উত্তর কোরিয়ার বার্তা
উত্তর কোরিয়া-এর নেতা কিম জং উন ইরানের পরিস্থিতির উদাহরণ টেনে বলেন, তাদের পারমাণবিক অস্ত্র ধরে রাখার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।
অতীতের শিক্ষা: গাদ্দাফি ও সাদ্দাম
মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও সাদ্দাম হোসেন—উভয়েই পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগের পর ক্ষমতাচ্যুত হন। ইউক্রেন-ও অস্ত্র ত্যাগ করে এখন অনুশোচনা করছে।
জেসিপিওএ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া
২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন থেকে বেরিয়ে যান। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ইউরোপে নতুন নিরাপত্তা ভাবনা
ন্যাটো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা ও রাশিয়া-র হুমকিতে ইউরোপ নতুন প্রতিরক্ষা জোট নিয়ে ভাবছে।
ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেছেন, বেলারুশে পারমাণবিক সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংকেত
ইরান যুদ্ধ সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসর-কে নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
এশিয়ায় পারমাণবিক প্রতিযোগিতা
ভারত ও পাকিস্তান আগেই পারমাণবিক শক্তিধর।
দক্ষিণ কোরিয়া-তে নিজস্ব অস্ত্র তৈরির পক্ষে জনসমর্থন ৭৬.২%।
জাপান-এও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জাপানের নীতি ও বিতর্ক
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি পারমাণবিক অস্ত্র না রাখা, না তৈরি করা ও না মোতায়েনের নীতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
তবে তারো কোনো প্রকাশ্য বিতর্কের পক্ষে মত দেন।
তাইওয়ান ও চীনের উত্তেজনা
তাইওয়ান পুনরায় পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করলে তা চীন-এর সঙ্গে সংঘাত বাড়াতে পারে—বিশ্লেষকদের মতে।
পারমাণবিক বিস্তার: ঝুঁকি ও বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, বেশি পারমাণবিক অস্ত্র মানেই ভুল বোঝাবুঝি ও যুদ্ধের ঝুঁকি বৃদ্ধি। তবে জেনিফার কাভানাঘ মনে করেন, নিরাপত্তা গ্যারান্টির ওপর নির্ভরতা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে।
আন্তর্জাতিক কাঠামোর প্রয়োজন
বিশ্ব যদি আরও পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে এগোয়, তবে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক কাঠামো বা নতুন পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি দরকার হবে, যাতে সব দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
আইএইএর মূল্যায়ন: ইরান কি অস্ত্র বানাচ্ছিল?
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, ইরানে বর্তমানে সুসংগঠিত গোপন পারমাণবিক কর্মসূচির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও বলেছে, “ইরান বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না।”
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দ্বিধা
রমেশ ঠাকুরের মতে, ইরানের এক সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, পারমাণবিক অস্ত্র ইসলামবিরোধী—কারণ এটি নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর চাপ বাস্তবতা বদলে দিতে পারে।
উপসংহার: নতুন পারমাণবিক যুগ?
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে বিরত রাখা। কিন্তু বাস্তবে এই পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের চাহিদা ও বিস্তার বাড়িয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন প্রধান আলোচ্য।