সমাজসেবা ও দাতব্য কার্যক্রমে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মহামান্য রাজার পক্ষ থেকে এমবিই (Member of the Order of the British Empire) সম্মানে ভূষিত হয়েছেন আবু তাহের। আগামী ১৩ মে, সোমবার ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস তাঁর রাজকীয় বাসভবন উইন্ডসর ক্যাসেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সম্মান প্রদান করবেন।
যুক্তরাজ্যের লন্ডনবাসী আবু তাহের একজন বিশিষ্ট ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতা, সাহিত্যিক ও পেশাদার হিসাবরক্ষক। পেশাগত জীবনে যেমন রয়েছে তাঁর সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, তেমনি সাংস্কৃতিক ও মানবিক কাজেও রয়েছে তাঁর অনুকরণীয় অবদান। তাঁর পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার বুধবারীবাজার ইউনিয়নের চন্দরপুর গ্রামে। তাঁর পিতা মরহুম মক্তার আলী এবং মাতা মাছুমা খাতুন। স্ত্রী, দুই পুত্র ও এক কন্যাসহ তিনি বর্তমানে লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগী আবু তাহের ছাত্রজীবনেই কবিতা ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হন, যা পরবর্তীতে তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যিক যাত্রার ভিত্তি রচনা করে। কবিতা, প্রবন্ধ ও নাটক রচনায় সমান দক্ষতার অধিকারী এই লেখকের সৃষ্টিকর্মে প্রবাসজীবন, মানবতা, সমাজসচেতনতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গভীর প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়।
বিলেতে নতুন প্রজন্মের লেখকদের অনুপ্রাণিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। বিশেষ করে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।
তার প্রকাশিত বই মার শালাদের মার, তদবির, পদইবাবু, বিয়ের ঘন্টা, সম্বর্ধনা। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারী গণমাধ্যমে প্রচারিত দর্শকপ্রিয় অন্যতমনাটক ও টেলিফিল্ম - সম্বর্ধনা ,বিয়ের ঘন্টা, শোধ, পদইবাবু ও গন্তব্য ।
১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানোর পর আবু তাহের একজন পেশাদার হিসাবরক্ষক হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৯৯ সালে পূর্ব লন্ডনে তিনি Mahi & Co Certified Practising Accountants প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে একটি সুপরিচিত ও সম্মানিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। পেশাগত দক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি ব্যক্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক পরামর্শ ও সেবা প্রদান করে আসছেন। তিনি Institute of Certified Practising Accountants-এর ফেলো সদস্য।
তিনি Shanghati Literary Society-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৮৮ সালে যুক্তরাজ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের তিনি প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বর্তমানে সভাপতির দায়িত্বে আছেন। তাঁর নেতৃত্বে সংগঠনটি যুক্তরাজ্যসহ আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে, যেখানে নিয়মিত কবিতা উৎসব, সাহিত্যসভা, কর্মশালা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। বিলেতে নতুন প্রজন্মের লেখকদের অনুপ্রাণিত করতে এবং ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব এবং মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে আবু তাহের সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর এই কর্মযজ্ঞ লন্ডনের বৈচিত্র্যময় কমিউনিটিতে এবং বাংলাদেশে সমানভাবে প্রশংসিত ও সম্মানিত।
তিনি Vision Care Foundation-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিনামূল্যে চক্ষুসেবা, অপারেশন ও চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। Masuma Memorial Trust-এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা প্রদান করে আসছেন তিনি। এছাড়া T5 Tailoring Training Centre প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে বিশেষত সুবিধাবঞ্চিত নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার ক্ষেত্রে তিনি সমাজে অনুসরণীয় অবদান রেখে চলেছেন।
বাংলাদেশের শিক্ষাখাতেও আবু তাহেরের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ও প্রশংসনীয় অবদান। তিনি সিলেটের গোলাপগঞ্জে অবস্থিত আল ইমদাদ ডিগ্রি কলেজ-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।
এছাড়াও তিনি সিলেটের ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় ব্রিজ অ্যাকাডেমি-র প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, যা দেশের শিক্ষাখাতে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ব্রিজ অ্যাকাডেমির মূল লক্ষ্য হলো সকল শিশু ও তরুণদের ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে (আইসিটি) দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলা।
এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের আওতায় অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণের জন্যও ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে বিশেষ কোর্সের সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া আবু তাহের ব্যক্তিগতভাবে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করেন।
আবু তাহেরের একটি স্বপ্নের প্রকল্প হলো Heaven Care Home-যেখানে বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষদের জন্য একটি সম্মানজনক ও সুরক্ষিত আশ্রয় গড়ে তোলার পরিকল্পিত কাজ চলছে। তিনি বিশ্বাস করেন, সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবতার পরিচয়।
যুক্তরাজ্যে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে নবীন ও প্রবীণদের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে আবু তাহেরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও দক্ষতায় যুক্তরাজ্যে পর পর দুটি গোলাপগঞ্জ উৎসব সফলভাবে আয়োজিত হয়, যেখানে ৫০টিরও বেশি সংগঠন অংশগ্রহণ করে এবং প্রতিটি অনুষ্ঠানে ১,০০০-এরও বেশি কমিউনিটি সদস্য যোগ দেন।
উৎসবে সমাজ ও ব্যক্তিগত সাফল্যের মাধ্যমে বাংলাদেশি তথা নিজ অঞ্চলকে কমিউনিটিতে উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরার জন্য গুণীজনদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। একইসঙ্গে বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে আসা প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রবীণদের অবদানের মূল্যায়নস্বরূপ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের সম্মানিত করা হয়। তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও সহিংসতার পথ থেকে ফিরিয়ে এনে বাংলাদেশি ঐতিহ্য ও শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত রাখার প্রত্যয়ও এই উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
৫২বাংলাকে এমবিই প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবু তাহের বলেন, "সবসময়ই আমার কাজের মূল লক্ষ্য ছিল -মানুষের কল্যাণ, সংস্কৃতির বিকাশ এবং প্রজন্মের মধ্যে মূল্যবোধের সেতুবন্ধন তৈরি করা। আমি বিশ্বাস করি, সফলতা শুধু ব্যক্তিগত অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানোই প্রকৃত সার্থকতা।‘‘
-
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে উৎসবমুখর আয়োজন
-
কমনওয়েলথ সভায় বাংলাদেশ : রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু তুললেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
-
লন্ডনে 'লতা দিয়া ফতা': সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ব্যতিক্রমী সেহরি আয়োজন
-
লন্ডনে হাই কমিশনারকে ‘প্রত্যাহার’ এর খরব দিলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
-
অবৈধ অভিবাসী দেশে ফিরলে মিলবে ১০ হাজার পাউন্ড