মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বুধবার রাতে ‘তীব্র আঘাত’ হানার ইঙ্গিত দেওয়ার পরপরই ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির বন্দর নগরী সিরিক ও বন্দর আব্বাসসহ দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার রাতভর উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সবশেষ হামলার পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশালে লিখেছেন, “জাহাজে গতকাল ইরানের বোমা হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। এমনটা আবারও ঘটলে পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে!”
ইরান এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে এর আগে দেশটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো হামলার ‘তাৎক্ষণিক জবাব’ দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানায়, গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথে ‘নৌচলাচলের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলার প্রশ্নে তেহরানের সক্ষমতা আরও দুর্বল করতে’ এই হামলা পরিচালিত হয়েছে।
এক বিবৃতিতে CENTCOM বলেছে, “একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অযৌক্তিক আগ্রাসনের জন্য ইরানকে দায়ী করছে যুক্তরাষ্ট্র।”
কোনারক, চাবাহার শহরসহ ইরানের উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসে আটটি বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং সিরিক ও জাস্ক বন্দরে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এসব এলাকা দক্ষিণ ইরানে অবস্থিত।
টেলিভিশনটি আরও জানায়, দুটি প্রজেক্টাইল আবু মুসা দ্বীপে আঘাত হেনেছে। দ্বীপটির মালিকানা নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্দর আব্বাসে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এখনো জানা যায়নি। তবে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, চাবাহারে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটেছে এবং বুশেহরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC)-এর একটি ব্যারাকে আগুন লেগেছে।
ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, চাবাহারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া তিনটি বিদ্যুৎ লাইনের মধ্যে দুটি দ্রুত সচল করা হয়েছে এবং তৃতীয়টি শিগগির চালু হবে।
বুধবার সন্ধ্যায় ‘এয়ার ফোর্স ওয়ানে’ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরান ‘কিছুক্ষণ আগে ফোন করেছিল’ এবং তারা একটি চুক্তি করতে ‘খুবই মরিয়া’ হয়ে উঠেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমি ঠিক জানি না যে তারা আদৌ চুক্তি করার উপযুক্ত কি না; আমি জানি না যে তারা চুক্তিটিকে সম্মান করবে কিনা, এটাই সমস্যা।”
এর আগে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, প্রণালিতে তিনটি ট্যাংকারে হামলার জবাবে তারা ‘শক্তিশালী’ আঘাত হেনেছে।
এর পাল্টা হিসেবে ইরান বুধবার দাবি করে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর মঙ্গল ও বুধবারের সংঘাতই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ট্রাম্প বুধবার বলেন, গত মাসে ইরানের সঙ্গে সই হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি ‘শেষ’ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র “গত রাতে তাদের ওপর খুব শক্ত আঘাত হেনেছে” এবং “সম্ভবত আজ রাতেও তাদের ওপর তীব্র আঘাত হানবে।”
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “আমি আর তাদের সঙ্গে কোনো লেনদেন করতে চাই না, ওরা হচ্ছে নিচু জাতের মানুষ। আপনারা জানেন নিচু জাতের মানুষ কাকে বলে? তারা নিচু জাতের মানুষ। তারা অসুস্থ মানসিকতার মানুষ।”
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এক্স পোস্টে বলেন, “আমরা অসভ্যতার জবাব অসভ্যতা দিয়ে দিই না, বরং কাজ দিয়ে দিই: নির্ভীকভাবে এবং অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চুক্তিতে ১৪টি শর্ত ছিল, যার মধ্যে অন্যতম ছিল—৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
আলোচনার নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা এখনো শেষ হয়নি, তবে ট্রাম্প বলছেন, তিনি পরবর্তী আলোচনা ‘সময়ের অপচয়’ হিসেবে দেখছেন।
সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর এটিই প্রথম হামলার ঘটনা নয়। গত ২৬ জুন হরমুজ প্রণালিতে একটি মালবাহী জাহাজে ইরানি প্রজেক্টাইল আঘাত হানার পর যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিক হামলা চালায়।
এরপর ২৭ জুন একটি ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় আবারও মার্কিন হামলা হয়। যদিও মাসের শেষ দিকে উভয় পক্ষ ‘সংযত থাকার’ বিষয়ে সম্মত হয়েছিল।
কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলা
যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয়বারের মতো ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় হামলা চালানোর পর প্রতিবেশী কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হানে তেহরান।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC) জানায়, বৃহস্পতিবার ভোরে কুয়েত ও বাহরাইনে দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে।
এক বিবৃতিতে IRGC জানায়, কুয়েতের আরিফজান ও আলি আল সালেম এবং বাহরাইনের জুফাইর ও শেখ ঈসা ঘাঁটির ‘প্রধান অবকাঠামো ও স্থাপনাগুলোতে’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে আঘাত হানা হয়েছে।
কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা’ প্রতিহত করছে।
গাল্ফ নিউজ বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরে দেশটিতে আকাশ হামলার সতর্কতা দিয়ে সাইরেন বাজানো হয়। নাগরিকদের ‘শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে নিকটবর্তী নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলা হয়েছে’।
যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় হামলা চালালে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা অন্যান্য মার্কিন ঘাঁটিতেও আক্রমণ বিস্তৃত হবে বলে সতর্ক করেছে IRGC।
IRGC জানায়, মার্কিন বাহিনী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় প্রদেশগুলোতে এবং ‘পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর পবিত্র শহর মাশহাদমুখি দুটি সড়কের দুটি সেতুতে’ হামলা চালিয়েছে। এর জবাবেই কুয়েত ও বাহরাইনে আঘাত হানা হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে বৃহস্পতিবার মাশহাদে দাফন করার কথা রয়েছে। এই ঐতিহাসিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানকে ম্লান করতেই যুক্তরাষ্ট্র এসব হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান।
ইরানি গণমাধ্যম IRIB জানিয়েছে, উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় গোলেস্তান প্রদেশের আক্কালা শহরের কাছে আক টেকেহ খান সেতু লক্ষ্য করে সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে, এতে একটি রেললাইনে দুটি বিস্ফোরণ ঘটে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর CENTCOM জানিয়েছে, তারা ইরানের ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।