ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ালেও নতুন করে আলোচনা শুরুর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে নিজ দেশেই তিনি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমার মুখোমুখি—১ মে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ৬০ দিন সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার বিষয়ে কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর পর এই ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হচ্ছে ১ মে।
বিশেষজ্ঞরা এই তারিখটিকে ইরান-সংক্রান্ত সামরিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ডেডলাইন’ হিসেবে দেখছেন। কারণ এই সময়ের মধ্যে ট্রাম্পকে হয় কংগ্রেসের কাছ থেকে নতুন করে সামরিক অভিযানের অনুমোদন নিতে হবে, নয়তো আইন অনুযায়ী মার্কিন বাহিনীকে ওই অঞ্চল থেকে প্রত্যাহার করতে হবে বা অভিযান বন্ধ করতে হবে।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—১ মের পর ট্রাম্প থামবেন, নাকি আইন অমান্য করে যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন?
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) Al Jazeera এক প্রতিবেদনে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলিউশন’ অনুযায়ী চলমান কোনো সংঘাতে ৬০ দিনের বেশি সেনা মোতায়েন রাখতে হলে ১ মের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে। এই অনুমোদন ছাড়া নতুন করে সেনা মোতায়েনও সম্ভব নয়।
এই অনুমোদনের জন্য প্রতিনিধি পরিষদ (United States House of Representatives) এবং United States Senate—উভয় কক্ষেই সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় যৌথ প্রস্তাব পাস হতে হয়। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো উদ্যোগ সফল হয়নি।
অবশ্য অতীতে অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট অন্যান্য আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে এই সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে সামরিক অভিযান চালিয়েছেন।
‘ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট’ কী?
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৩ সালে প্রণীত এই ফেডারেল আইনটির লক্ষ্য ছিল বিদেশে সামরিক সংঘাতে প্রেসিডেন্টের একক ক্ষমতা সীমিত করা।
আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টকে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে জানাতে হয়। এরপর তিনি সর্বোচ্চ ৬০ দিন সেনা মোতায়েন রাখতে পারেন। প্রয়োজনে কংগ্রেস অতিরিক্ত ৩০ দিন সময় বাড়াতে পারে অথবা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের অনুমোদন দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের University of Colorado Law School-এর সহযোগী অধ্যাপক Maryam Jamshidi বলেন, “৬০ দিনের সময়সীমা আরও ত্রিশ দিন বাড়াতে হলে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসে লিখিতভাবে প্রমাণ দিতে হবে যে, ইরানে সশস্ত্র বাহিনীর ব্যবহার ‘অবশ্যম্ভাবী সামরিক প্রয়োজনীয়তা’। এর বাইরে কংগ্রেস অনুমোদন না দিলে সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য।”
তবে তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্টকে এই নিয়ম মানতে বাধ্য করার কোনো স্পষ্ট আইনি উপায় কংগ্রেসের হাতে নেই। অতীতে অনেক প্রেসিডেন্ট এই আইনকে অসাংবিধানিক দাবি করে উপেক্ষা করেছেন।
কংগ্রেস কি যুদ্ধের অনুমোদন দেবে?
মার্কিন কংগ্রেসে ক্ষমতাসীন Republican Party ও বিরোধী Democratic Party-এর মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের অনুমোদন পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
১৫ এপ্রিল সিনেটে ট্রাম্পের সামরিক ক্ষমতা সীমিত করার একটি প্রচেষ্টা ৫২-৪৭ ভোটে ব্যর্থ হয়। ভোটাভুটিতে দুই দলের সদস্যরা মূলত দলীয় অবস্থান অনুযায়ী ভোট দিয়েছেন।
রিপাবলিকানদের একটি অংশ প্রেসিডেন্টের কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করলেও অনেকে বলছেন, ৬০ দিনের পর ইরানে সামরিক অভিযান চালাতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন অবশ্যই প্রয়োজন।
রিপাবলিকান সেনেটর John Curtis এবং কংগ্রেস সদস্য Don Bacon স্পষ্টভাবে বলেছেন, আইনি অনুমোদন ছাড়া ৬০ দিনের বেশি সামরিক অভিযান চালানো সম্ভব নয়।
১ মের পর কি ট্রাম্প যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন?
যুক্তরাষ্ট্রের Bowdoin College-এর ইতিহাসের অধ্যাপক Salar Mohandesi বলেন, “ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ জনমত এর বিপক্ষে। তবে তিনি কোনো না কোনোভাবে এটি চালিয়ে যেতে পারেন।”
তিনি আরও বলেন, “ট্রাম্প তার দেশবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ইরানের কাছ থেকে ভালো চুক্তি আদায় করবেন এবং যুদ্ধে জড়াবেন না। এখন যদি তিনি সরে আসেন, তাহলে সেটি পরাজয় হিসেবে দেখা হবে। আর ট্রাম্প একজন জুয়াড়ি; তাই জয়ের আশায় তিনি সংঘাত আরও বাড়াতে পারেন।”
কংগ্রেসকে পাশ কাটানোর উপায় কী?
মার্কিন কংগ্রেসের ‘অথরাইজেশন ফর ইউজ অব মিলিটারি ফোর্স’ (AUMF) প্রেসিডেন্টকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সামরিক শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা দেয়।
২০০১ সালে ৯/১১ হামলার পর এবং ২০০২ সালে ইরাক আক্রমণের জন্য এই আইন পাস হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট Barack Obama এবং ট্রাম্প ২০২০ সালে Qasem Soleimani হত্যার সময় এই আইনের ভিত্তিতে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
১৯৭৩ সালের পর থেকে অনেক প্রেসিডেন্টই কংগ্রেসের সরাসরি অনুমোদন ছাড়া সামরিক অভিযান চালিয়েছেন। ১৯৯৯ সালে Bill Clinton যুগোস্লাভিয়ায় ৭৯ দিন ধরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন।
২০১১ সালে লিবিয়া অভিযানের সময় ওবামা প্রশাসন যুক্তি দেয়, সেখানে ‘সম্মুখ যুদ্ধ’ না হওয়ায় এটি ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলিউশনের আওতায় পড়ে না। ফলে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই অভিযান চালানো সম্ভব হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পও এমন কোনো আইনি ব্যাখ্যা বা ফাঁকফোকর খোঁজার চেষ্টা করতে পারেন।